মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধে ১ লাখ মানুষের মৃত্যু
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে সব পক্ষ মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে। আজ বুধবার আন্তর্জাতিক সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা প্রজেক্ট’ (এসিএলইডি) এই ভয়াবহ তথ্য নিশ্চিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের এই চলমান গৃহযুদ্ধ বর্তমানে এশিয়ার সবচেয়ে প্রাণঘাতী ও নৃশংস সংঘাতগুলোর একটি।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে নোবেলজয়ী অং সান সু চিকে কারাবন্দি করে। এর মাধ্যমে দেশটির এক দশকের গণতান্ত্রিক যাত্রার অবসান ঘটে। অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমন করতে সামরিক জান্তা কঠোর বলপ্রয়োগ করলে আন্দোলনকারীরা শহর ছেড়ে দুর্গম এলাকায় সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরবর্তীতে তারা বিভিন্ন জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট বেঁধে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করে। এসিএলইডির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সংঘাত-সম্পর্কিত ঘটনায় ১ লাখ ১১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
টানা পাঁচ বছর মিয়ানমার সরাসরি সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের শাসনের অধীনে থাকার পর, সম্প্রতি অত্যন্ত সীমিত পরিসরে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে গত এপ্রিলে বেসামরিক রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে জান্তাবিরোধী এলাকাগুলোতে কোনো ভোট হয়নি এবং সু চির দলকেও অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। গণতন্ত্রপন্থী পর্যবেক্ষকরা এই নির্বাচনকে ক্ষমতা ধরে রাখার একটি প্রহসন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা বলে আখ্যা দিয়েছেন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে এ পর্যন্ত ৩৭ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। দেশজুড়ে তীব্র দারিদ্র্য গ্রাস করছে এবং প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন মারাত্মক খাদ্য সংকটে ভুগছেন। দেশের বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুনে সহিংসতা এখন গুপ্তহত্যার রূপ নিয়েছে, অন্যদিকে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে জান্তা বাহিনীর যুদ্ধবিমান থেকে প্রায় প্রতিদিনই বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বিমান হামলা চালানো হচ্ছে।
২০২৩ সালের শেষ দিকে বিদ্রোহীদের সমন্বিত ‘অপারেশন ১০২৭’ আক্রমণে জান্তা বাহিনী বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়ে এবং বিদ্রোহীরা দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের দিকে অগ্রসর হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় দুটি শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ায় এবং চীনের পরোক্ষ সমর্থনে সামরিক বাহিনী আবারও কৌশলগত সুবিধা ফিরে পায়। এর মাঝে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৈন্যসংকট মোকাবিলায় জান্তা সরকার বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা আইন কার্যকর করে প্রায় ৫০ হাজার যুবককে জোরপূর্বক যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠায়।
মিয়ানমারের এই দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাব দেশটির সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। শরণার্থী শিবিরে চাপ বৃদ্ধির পাশাপাশি সংঘাতে জড়িত গোষ্ঠীগুলো হেরোইন ও মেথামফেটামিনের মতো মাদক পাচার এবং আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা চক্রের মাধ্যমে যুদ্ধের খরচ চালাচ্ছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
তথ্যসূত্র: বিজনেস রেকর্ডার
এআইএল/সকালবেলা
|