সুস্থ থাকতে খেজুর খাওয়ার ৫ স্বাস্থ্যকর ও কার্যকরী উপায়
লাইফস্টাইল ডেস্ক: পবিত্র রমজান মাস হোক কিংবা বছরের অন্য যেকোনো সাধারণ সময়— ফল হিসেবে খেজুর অনেকেরই ভীষণ পছন্দের। মিষ্টি ও সুস্বাদু এই ফলটিকে বিশ্বজুড়ে পুষ্টিবিদরা পরিশোধিত বা সাদা চিনির সবচেয়ে চমৎকার ও স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করেন। খেজুরে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক চিনি থাকলেও এতে থাকা উচ্চমাত্রার খাদ্যআঁশ বা ফাইবার রক্তে শর্করার মাত্রা (ব্লাড সুগার) হঠাৎ করে বেড়ে যেতে বাধা দেয়। একই সাথে এটি আমাদের পরিপাকতন্ত্রকে সচল রেখে হজমপ্রক্রিয়া উন্নত করতে দারুণ ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী ‘ভেরিওয়েল ফুড’-এর এক প্রতিবেদনে খেজুর খাওয়ার বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যকর দিক তুলে ধরা হয়েছে।
বাজার থেকে আমরা সাধারণত তাজা, শুকনা, পেস্ট কিংবা সিরাপ— বিভিন্ন রূপে খেজুর কিনে থাকি। প্রতিটি ধরনেরই রয়েছে আলাদা স্বাদ, গঠন এবং স্বতন্ত্র পুষ্টিগুণ। সঠিক নিয়ম মেনে পরিমিত পরিমাণে খেলে খেজুর আপনার দৈনন্দিন পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসের একটি অন্যতম সেরা অংশ হয়ে উঠতে পারে। সুস্থ থাকতে যেভাবে খেজুর খাবেন, তার ৫টি স্বাস্থ্যকর উপায় নিচে আলোচনা করা হলো:
১. তাজা খেজুরের রসালো স্বাদ গ্রহণ: বিকেলের বা কাজের ফাঁকের নাশতা (স্ন্যাকস) হিসেবে তাজা বা কাঁচা খেজুর অত্যন্ত উপযোগী। শুকনা খেজুরের তুলনায় এতে পানির পরিমাণ বেশি থাকায় এটি অনেক নরম, রসালো এবং সহজে হজমযোগ্য হয়। তাজা খেজুরের প্রধান সুবিধা হলো, এতে ক্যালোরি ও প্রাকৃতিক চিনির ঘনত্ব তুলনামূলক কম থাকে এবং এটি শরীরে খুব দ্রুত এনার্জি বা শক্তি জোগায়। সাধারণত তাজা খেজুর পাকার তিনটি পর্যায়ে খাওয়া যায়— খালাল (শক্ত, হলুদ ও হালকা মিষ্টি), রুতাব (নরম, বাদামি ও তীব্র মিষ্টি) এবং তামার (পুরোপুরি পাকা ও ক্যারামেলের মতো স্বাদযুক্ত)। তবে তাজা খেজুর দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকায় এটি ফ্রিজে সংরক্ষণ করা উচিত।
২. শুকনা খেজুর পরিমিত খাওয়া: বাজারের সবচেয়ে চেনা ও সহজলভ্য রূপ হলো শুকনা খেজুর। কিশমিশের মতো চিবিয়ে খাওয়া এই খেজুর দীর্ঘদিন সাধারণ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যায়। শুকনা খেজুরে তাজা খেজুরের চেয়ে চিনি ও ক্যালোরি বেশি থাকলেও এতে ফাইবারের পরিমাণ থাকে অনেক বেশি। ফলে এটি খেলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকে এবং অলসতা দূর করে ধীরে ধীরে শরীরে দীর্ঘমেয়াদি শক্তি সরবরাহ করে। এছাড়া শুকনা খেজুরে রয়েছে পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন বি৬, নিয়াসিন, কপার এবং সেলেনিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ। তবে যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তাদের জন্য একবারে অনেকগুলো শুকনা খেজুর না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।
৩. বেকিংয়ে খেজুরের পেস্ট বা বাটার: খেজুরের ভেতরের নরম শাঁস থেকে সহজেই তৈরি করা যায় খেজুরের পেস্ট। কেক, মাফিন, কুকিজ, পুডিং বা বিভিন্ন বেকড খাবারে ক্ষতিকর পরিশোধিত সাদা চিনির পরিবর্তে এই পেস্ট ব্যবহার করা যায়। খেজুরের পেস্টের বিশেষ সুবিধা হলো, এটি রান্নায় অতিরিক্ত ক্যালোরি যোগ না করেই পর্যাপ্ত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবার সরবরাহ করে। খেজুর দিয়ে পেস্ট ছাড়াও ঘরে বসেই তৈরি করা যায় অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর বাটার, জ্যাম ও জেলি।
৪. চিনির বদলে খেজুরের খাঁটি সিরাপ: খেজুরের ঘন ও আঠালো গঠন একে বিভিন্ন রান্না ও বেকিংয়ের জন্য আদর্শ প্রাকৃতিক মিষ্টিকারক (Natural Sweetener) হিসেবে গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে দারুচিনি, এলাচ, আদা, বিভিন্ন বাদাম ও ওটসের তৈরি খাবারের সাথে খেজুরের সিরাপের স্বাদ খুব চমৎকারভাবে মানিয়ে যায়। খেজুরের সিরাপে চিনির পরিমাণ বেশি থাকলেও এতে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা সাধারণ চিনির চেয়ে একে বহুগুণ পুষ্টিগুণসম্পন্ন করে তোলে। তবে ওজন নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রি-ডায়াবেটিস থাকলে সিরাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পরিমিতিবোধ বজায় রাখা জরুরি।
৫. ফারমেন্টেড খেজুরের বিকল্প ব্যবহার: খেজুরে প্রাকৃতিক শর্করা বেশি থাকায় একে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ফারমেন্ট বা গাঁজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ওয়ান-অফ স্বাস্থ্যকর ভিনেগার ও ঔষধি পানীয় তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, খেজুরের পুষ্টিগুণ ধরে রেখে এর রস থেকে তৈরি ভিনেগার শরীরের কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বেশ কার্যকর।
প্রতিদিনের ডায়েটে যেভাবে খেজুর যোগ করবেন: খুব সহজেই আপনি আপনার প্রতিদিনের খাবারে খেজুর যুক্ত করতে পারেন। যেমন— সকালের পুষ্টিকর স্মুদি বা ডেইরি মিল্কশেকে, দুপুরের টক দইয়ের সাথে মিক্সড করে, ওটস বা সালাদে কুচি করে কেটে, কিংবা বিকেলের নাশতায় পিনাট বাটার ও ডার্ক চকলেটের ভেতরে খেজুরের টুকরো পুরে দিয়ে একটি অসাধারণ স্বাস্থ্যকর ডেজার্ট হিসেবে।
পুষ্টিবিদদের মতে, সুস্থ মানুষের পাশাপাশি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরাও পরিমিত পরিমাণে নিয়মিত খেজুর খেতে পারেন, কারণ এর ফাইবার ব্লাড সুগার স্পাইক বা হঠাৎ রক্তে চিনি বেড়ে যাওয়া প্রতিরোধ করে। তবে মনে রাখবেন, যেকোনো ভালো জিনিসেরই অতিরিক্ত ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, তাই খেজুর খাওয়ার ক্ষেত্রেও অতিভোজন পরিহার করা শ্রেয়।
|