বিএডিসির সারগুদাম উন্নয়ন প্রকল্পে নতুন দিগন্ত

প্রকাশ: শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৪ অপরাহ্ণ
বিএডিসির সারগুদাম উন্নয়ন প্রকল্পে নতুন দিগন্ত

অনক আলী হোসেন শাহিদী: দেশের কৃষি উৎপাদন ব্যাহতহীনভাবে সচল রাখতে সময়মতো ও নিরাপদ উপায়ে সারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে ‘বিএডিসির বিদ্যমান সারগুদামসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ, পুনর্বাসন এবং নতুন গুদাম নির্মাণের মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জোরদারকরণ’ শীর্ষক একটি বৃহৎ অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প।

২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই মেগা প্রকল্পটি বিগত ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়েছে। পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হয়েছে ৩৫০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। বর্তমানে প্রকল্পটির প্রকল্প পরিচালক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন মো. মুজিবুর রহমান খান, যিনি ২০২৩ সাল থেকে এ দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। এর আগে আরও দুজন প্রকল্প পরিচালক পর্যায়ক্রমে এই প্রকল্পের গুরুদায়িত্ব পালন করেন।

প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের সার সংরক্ষণ সক্ষমতা বর্তমান অবস্থার তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করা এবং কৃষকদের জন্য সারা বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে রাসায়নিক সার সরবরাহ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সার সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে আধুনিক, সম্পূর্ণ নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত পর্যায়ে উন্নীত করাও ছিল এ প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

প্রকল্পের আওতায় অর্জিত মূল সাফল্যসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো: নতুন গুদাম নির্মাণ: দেশের কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অন্তত ৩০টি জেলার বিভিন্ন কৃষি-নিবিড় এলাকায় ৪২টি নতুন আধুনিক সারগুদাম নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন সার সংরক্ষণের নতুন সক্ষমতা সৃষ্টি হয়েছে। মোট সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ: নতুন গুদামগুলোর পাশাপাশি বিদ্যমান অবকাঠামোসহ বর্তমানে মোট প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন সার সংরক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী সুশৃঙ্খলভাবে বিতরণের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়েছে। ফলে মৌসুমভিত্তিক সার সরবরাহ ব্যবস্থা এখন অনেক বেশি কার্যকর। জরাজীর্ণ গুদাম পুনর্বাসন: প্রকল্পের আওতায় দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত, পুরোনো ও জরাজীর্ণ ৯২টি সারগুদাম সংস্কার ও পুনর্বাসন করা হয়েছে। এর ফলে গুদামগুলো পুনরায় নিরাপদ সার সংরক্ষণের উপযোগী হয়েছে এবং সারের গুণগত মান বজায় রাখা সহজ হচ্ছে।

সার ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু হওয়ায় খোলা আকাশের নিচে সার ফেলে রাখার প্রয়োজনীয়তা এখন অনেকাংশে কমেছে। ফলে বৃষ্টি, অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সারকে সুরক্ষিত রেখে এর আসল গুণগত মান ও কার্যকারিতা অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হচ্ছে, যার সুফল সরাসরি পাচ্ছেন দেশের প্রান্তিক কৃষকেরা।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) চেয়ারম্যান মোঃ আজিজুল ইসলাম বলেন, "কৃষকের কাছে সময়মতো মানসম্মত সার পৌঁছে দিতে আধুনিক সংরক্ষণ অবকাঠামোর কোনো বিকল্প নেই। এ প্রকল্পের মাধ্যমে সার সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতেও সার সংরক্ষণ সক্ষমতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধিতে বিএডিসি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে।"

প্রকল্প পরিচালক মো. মুজিবুর রহমান খান বলেন, "নিরাপদভাবে সার সংরক্ষণ কৃষি উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। বর্তমান প্রকল্পের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হলেও দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিবেচনায় আরও ১০ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন নতুন সারগুদাম নির্মাণ করা প্রয়োজন। এতে আনুমানিক ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। যেহেতু চলমান প্রকল্পটি ৩০ জুন সমাপ্ত হয়েছে, তাই এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য নতুন উদ্যোগ গ্রহণ বা প্রকল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন।"

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই. মোহাম্মদ বলেন, "কৃষির টেকসই উন্নয়নে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি দক্ষ সার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিএডিসির এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের সার সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আধুনিক গুদাম ব্যবস্থার ফলে সার নিরাপদভাবে সংরক্ষণ ও সময়মতো কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া আরও সহজ হয়েছে।"

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদ এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, "কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার কৃষি খাতের আধুনিকায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। সার সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিএডিসির এই প্রকল্প সরকারের কৃষিবান্ধব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। আধুনিক গুদাম অবকাঠামো গড়ে ওঠায় কৃষকের কাছে সময়মতো মানসম্মত সার পৌঁছে দেওয়া আরও সহজ হয়েছে।"

তিনি আরও যোগ করেন, "ভবিষ্যতেও কৃষি অবকাঠামোর উন্নয়ন, প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় সকল উপকরণ নিশ্চিত করতে সরকার ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। কৃষকের উন্নয়নই দেশের উন্নয়ন—এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে উৎপাদনশীল, আধুনিক ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার দৃঢ়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।"

এআইএল/সকালবেলা

মন্তব্য করুন