প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন: পাট বীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে বিএডিসি
অনক আলী হোসেন শাহিদী: দেশে ব্যবহৃত পাট বীজের শতভাগ চাহিদা দেশের অভ্যন্তরেই পূরণের লক্ষ্যে একটি যুগোপযোগী ও সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার আলোকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে গৃহীত এই উদ্যোগ সফল হলে আগামী চার বছরের মধ্যে দেশে স্থায়ীভাবে ৫ হাজার মেট্রিক টন পাট বীজ উৎপাদন সম্ভব হবে। এর ফলে পাট বীজ আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা সম্পূর্ণভাবে দূর হবে, প্রতিবছর ৮০ থেকে ১০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং কৃষকেরা সহজলভ্য মূল্যে উন্নতমানের দেশীয় পাট বীজ পাবেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্মারক নং ০৩.২৪.০০০০.০৭৬.৪৫.০০১.২০ (অংশ-১)-৩৭, তারিখ: ১৬ মার্চ ২০২৬-এর মাধ্যমে পাটজাত পণ্যের বহুমুখী ব্যবহার ও বাজার সম্প্রসারণে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করা হয়। নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে— সরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত কাপড়, পর্দা, সোফার সিট কভারসহ বিভিন্ন উপকরণে জুটন কাপড়ের ব্যবহার নিশ্চিত করা; দেশের ব্যবহৃত পাট বীজের চাহিদা দেশের অভ্যন্তরেই উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা; পাট থেকে সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশেষ বৈঠকের আয়োজন; স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য পাটজাত স্কুলব্যাগ চালুর কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন; পাট থেকে কাগজ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পাট থেকে কাগজ ও জুটন উৎপাদন বৃদ্ধির কর্মপরিকল্পনা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দাখিল করা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-৯ মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সরোয়ার স্বাক্ষরিত এই নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে পাঠানো হয়।
পরবর্তীতে কৃষি মন্ত্রণালয় স্মারক নং ১২.০০.০০০০.০০০.০২৪.৯৯.০০১.২৬.১০২, তারিখ: ২৫ মার্চ ২০২৬-এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় নির্দেশনা—"দেশের ব্যবহৃত পাট বীজের চাহিদা যথাসম্ভব দেশের অভ্যন্তরেই উৎপাদনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে"—বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে জরুরি নির্দেশনা প্রদান করে।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পরপরই বিএডিসির চেয়ারম্যান মোঃ আজিজুল ইসলামের নেতৃত্বে একাধিক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভায় চার বছর মেয়াদি একটি বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ২০২৯-২০৩০ উৎপাদন বর্ষ থেকে স্থায়ীভাবে ৫ হাজার মেট্রিক টন পাট বীজ উৎপাদন নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশে প্রতিবছর কৃষকদের জন্য প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার মেট্রিক টন পাট বীজের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে বিএডিসি নিজস্ব সক্ষমতায় প্রায় ২ হাজার মেট্রিক টন পাট বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ করে থাকে। অবশিষ্ট চাহিদা পূরণে ভারত থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টন পাট বীজ আমদানি করতে হয়, যার জন্য প্রতিবছর প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়।
বিএডিসির নতুন কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা: ২০২৬-২০২৭ উৎপাদন বর্ষ: ২,২১০ মেট্রিক টন, ২০২৭-২০ slippery২৮ উৎপাদন বর্ষ: ৩,১৫০ মেট্রিক টন, ২০ can২৮-২০২৯ উৎপাদন বর্ষ: ৪,৪০০ মেট্রিক টন, ২০২৯-২০৩০ উৎপাদন বর্ষ: ৫,০০০ মেট্রিক টন (স্থায়ী লক্ষ্যমাত্রা)।
এই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে দেশের আরও ১২টি জেলায় নতুন ১২টি চুক্তিবদ্ধ পাট বীজ উৎপাদন জোন স্থাপন করা হবে। এর পাশাপাশি ১২টি নতুন বীজগুদাম নির্মাণ, ১২টি আধুনিক গ্রেডার মেশিন ক্রয় এবং প্রয়োজনীয় বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতি সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে একটি বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে এই কার্যক্রমের মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ধাপে ধাপে দেশীয় পাট বীজ উৎপাদন বৃদ্ধি করে ২০২৯-২০৩০ উৎপাদন বর্ষ থেকে স্থায়ীভাবে ৫ হাজার মেট্রিক টন পাট বীজ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জিত হবে। এর ফলে ভারত থেকে পাট বীজ আমদানির প্রয়োজনীয়তা দূর হবে এবং দেশ পাট বীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে।
পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্য, অর্থনীতি ও রপ্তানি খাতের অন্যতম প্রধান সম্পদ। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী দেশ এবং পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রথম অবস্থানে রয়েছে। দেশে প্রতিবছর প্রায় ৭.৫০ থেকে ৮.০০ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উন্নতমানের দেশীয় পাট বীজ সহজলভ্য হলে পাটের আবাদ আরও সম্প্রসারিত হবে এবং উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
পাট বীজ উৎপাদন কর্মসূচির মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছেন বিএডিসির পাট বীজ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কৃষিবিদ দেবদাস সাহা। তিনি বলেন, "বিএডিসির চেয়ারম্যানের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী মাঠ পর্যায়ে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যা যা করণীয়, আমরা তা ইতোমধ্যেই শুরু করেছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে এবং ২০২৭-২০ can২৮ অর্থবছর থেকে এই কার্যক্রম একটি প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে।"
বিএডিসির চেয়ারম্যান মোঃ আজিজুল ইসলাম বলেন, "বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন দেশের সার, বীজ ও সেচ ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। ১৯৬১ সাল থেকে আমরা কৃষি উন্নয়নে কাজ করে আসছি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে পাট বীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য একটি সুস্পষ্ট সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিএডিসির বিস্তৃত অবকাঠামো ও দক্ষ জনবলকে কাজে লাগিয়ে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। নতুন উৎপাদন জোন, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, উন্নত বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি এবং কৃষকদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন সম্প্রসারণের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ৫ হাজার মেট্রিক টন পাট বীজ উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি কৃষকরাও উন্নতমানের দেশীয় বীজ পাবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক নির্দেশনা বাস্তবায়নে বিএডিসি সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে এবং ইনশাআল্লাহ আমরা সফল হব।"
কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, "প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কৃষি মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে জরুরি নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে এবং তারা ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করেছে। কৃষিতে স্বনির্ভরতা অর্জনের জাতীয় লক্ষ্য বাস্তবায়নে এ কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।"
কৃষিমন্ত্রী মোঃ আমিন উর রশিদ বলেন, "দেশকে কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার ক্ষেত্রে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে কৃষি ও পাট খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই ধারাবাহিকতায় দেশের কৃষি ও পাট খাতকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাজ করছেন। পাট বীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের এই কর্মসূচি শুধু আমদানি নির্ভরতা কমাবে না, বরং কৃষকের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, পাটচাষ সম্প্রসারণ, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি।"
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, কৃষি বিষয়ক উপদেষ্টা ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ নজরুল ইসলাম খান বলেন, "বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি গ্রামভিত্তিক কৃষি উন্নয়ন এবং পাট শিল্পের বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়াও কৃষি ও পাট খাতের উন্নয়নে ধারাবাহিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে আরও এগিয়ে নিতে কাজ করছেন। পাট বীজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্যে বিএডিসি যে বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, আমি তাকে স্বাগত জানাই। এটি সফল হলে কৃষক, কৃষি ও জাতীয় অর্থনীতি—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।"
উল্লেখ্য যে, উন্নত পাট চাষ ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রয়োজনীয় পানি অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে পাট জাগ দিতে পাট চাষ এলাকায় পানির ব্যাপক প্রয়োজন হয়। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রকল্প এলাকায় খাল খনন কর্মসূচির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী এই ধরনের খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় বিএডিসিও দেশের পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চল নিয়ে খাল খননে দুটি বিশেষ প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশ সম্পূর্ণভাবে পাট বীজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। আমদানি নির্ভরতা দূর হবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, কৃষকরা সময়মতো উন্নতমানের বীজ পাবেন এবং পাটের উৎপাদন ও রপ্তানি উভয়ই আরও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে এটি কৃষি খাতে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সোনালী আঁশকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
এআইএল/সকালবেলা
|