বিশ্বকাপে স্পেন-পর্তুগাল মহারণ, মুখোমুখি রোনালদো ও ইয়ামাল

প্রকাশ: রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৪ অপরাহ্ণ
বিশ্বকাপে স্পেন-পর্তুগাল মহারণ, মুখোমুখি রোনালদো ও ইয়ামাল

স্পোর্টস ডেস্ক: ফুটবল বিশ্বের অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং ঐতিহ্যবাহী ‘আইবেরিয়ান ডার্বি’র সাক্ষী হতে যাচ্ছে চলমান ২০২৬ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ। মাত্র এক বছরের কিছু বেশি সময়ের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক ফুটবলের চেনা আঙিনায় আবারও মুখোমুখি হচ্ছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী স্পেন ও পর্তুগাল। তবে আগেরবার লড়াইটি ছিল উয়েফা নেশন্স লিগের ফাইনালের ট্রফি জয়ের, আর এবার মঞ্চটা আরও বড় ও মহিমান্বিত—বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার বাঁচা-মরার লড়াই। নেশন্স লিগের ফাইনালে টাইব্রেকারের সেই তেতো স্মৃতি ভুলে এবার বিশ্বমঞ্চে পর্তুগিজদের হারিয়ে মধুর প্রতিশোধের লক্ষ্য নিয়েই রণকৌশল সাজাচ্ছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল স্পেন।

উত্তর আমেরিকায় চলমান বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর (রাউন্ড অব ১৬) এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে বাংলাদেশ সময় আগামীকাল সোমবার রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসের মাঠে মুখোমুখি হবে দুই প্রতিবেশী আইবেরিয়ান প্রতিযোগী।

ফুটবলপ্রেমীদের মনে থাকার কথা, গত বছরের উয়েফা নেশন্স লিগের ফাইনালে নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত সময়ের খেলা ২-২ গোলে নাটকীয়ভাবে ড্র হয়েছিল। পরবর্তীতে টাইব্রেকারে ৫-৪ ব্যবধানে জিতে স্প্যানিশদের কাঁদিয়ে শিরোপা ঘরে তুলেছিল পর্তুগাল। সেই ম্যাচে স্পেনের ট্রফি জয়ের স্বপ্ন চুরমার করেছিল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দল। এবার ফুটবল বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে সেই হারের কড়ায়-গন্ডায় জবাব দিতে শতভাগ প্রস্তুত স্প্যানিশরা।

এই ফুটবল দ্বৈরথে কেবল দলীয় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই-ই থাকছে না, বরং ফুটবল বিশ্ব উপভোগ করতে যাচ্ছে দুই ভিন্ন প্রজন্মের দুই মহাতারকার মুখোমুখি লড়াইও। একদিকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা জীবন্ত কিংবদন্তি ও পর্তুগালের ৪১ বছর বয়সী অভিজ্ঞ অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, অন্যদিকে স্পেনের বার্সেলোনা ক্লাবের তরুণ সেনসেশন লামিন ইয়ামাল।

নেশন্স লিগের ফাইনালের সেই পরাজয়ের পর থেকে নিজেদের ফুটবলকে নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়েছে স্পেন। বর্তমানে টানা ৩৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অপরাজিত থাকার অবিশ্বাস্য এক আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামবে ‘লা রোখা’রা। বলের নিখুঁত দখল, চোখের পলকে দ্রুত আক্রমণ কাউন্টার অ্যাটাক গড়া এবং নিশ্ছিদ্র সংগঠিত রক্ষণ—সব মিলিয়ে দারুণ ছন্দে রয়েছে স্পেন। বিশেষ করে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে জাপানের বিপক্ষে গোল হজম করার পর থেকে আজ অবধি বিশ্বকাপের মঞ্চে আর কোনো দলই স্পেনের জালের ঠিকানা খুঁজে পায়নি।

তবে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ভালো করেই জানেন, রবের্তো মার্তিনেসের পর্তুগালও সমান শক্তিশালী ও বিধ্বংসী প্রতিপক্ষ। দলটির মাঝমাঠে ভিতিনিয়া, জোয়াও নেভেস ও ব্রুনো ফার্নান্দেসের মতো সৃজনশীল ও বিশ্বমানের ফুটবলাররা যেকোনো মুহূর্তে একক নৈপুণ্যে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। তা ছাড়া নেশন্স লিগের ফাইনালে জয়ের মনস্তাত্ত্বিক সুবিধাও পর্তুগালকে বাড়তি টনিক জোগাবে।

পর্তুগালের রক্ষণভাগের অন্যতম বড় স্তম্ভ ও ভরসা হলেন তরুণ নুনো মেন্দেস। গতবারের ফাইনালে স্পেনের বিষাক্ত উইঙ্গার লামিন ইয়ামালকে একাই বোতলবন্দি করে রেখে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন পিএসজির এই ডিফেন্ডার। এবারও স্পেনের আক্রমণভাগের সামনে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়ানোর গুরুদায়িত্ব থাকবে তাঁর ওপর।

অন্যদিকে, স্পেনের আক্রমণভাগেও রয়েছে যথেষ্ট ধার ও গোল করার বৈচিত্র্য। দলটির ফরোয়ার্ড মিকেল ওইয়ারসাবাল প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই নিয়মিত গোল পাচ্ছেন। ইয়ামাল টুর্নামেন্টে এখনও নিজের চেনা ছন্দে ফিরতে না পারলেও শেষ বত্রিশের ম্যাচে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের দাপুটে জয়ে নিজের সামর্থ্যের পুরো ঝলক দেখিয়েছেন। ম্যাচ শেষে এই তরুণ ফরোয়ার্ড হুংকার দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমাদের পারফরম্যান্সে আরও কিছু উন্নতি করতে হবে ঠিকই, তবে আমরা বিশ্বের কোনো দলকেই ভয় পাই না।’

পর্তুগালের এবারের নকআউট যাত্রা অবশ্য খুব একটা মসৃণ বা সহজ ছিল না। শেষ বত্রিশের (রাউন্ড অব ৩২) ম্যাচে শক্তিশালী ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ গোলে হারাতে রেফারি ও ৪টি গোল বাতিলের ভিএআর নাটকের কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে রবের্তো মার্তিনেসের দলকে। এমনকি গ্রুপ পর্বেও মাত্র এক জয় ও দুই ড্র নিয়ে রানার্সআপ হিসেবে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছিল তারা।

ডালাসের এই মেগা ম্যাচেও ফুটবল বিশ্বের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ৪১ বছর বয়সেও মাঠের গতি আর গোলের ক্ষুধা বিন্দুমাত্র হারাননি এই পর্তুগিজ মহাতারকা। গত নেশন্স লিগের ফাইনালেও তাঁর জাদুকরী গোলেই সমতায় ফিরেছিল পর্তুগাল, যা পরে টাইব্রেকারে দলকে চ্যাম্পিয়ন করে। ক্যারিয়ারের ঐতিহাসিক ১০০০তম (হাজারতম) গোলের অবিশ্বাস্য মাইলফলকের দিকে ধাবমান রোনালদোর জন্য জাতীয় দলের প্রতিটি ম্যাচই এখন ভীষণ আবেগ ও স্পেশাল। কিছুদিন আগে তাঁর আপন বোনের দাবি অনুযায়ী, এই উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের পরই হয়তো আন্তর্জাতিক ফুটবলকে চিরতরে বিদায় জানাতে পারেন এই মহাতারকা। ফলে ম্যাচটির গুরুত্ব রোনালদো ভক্তদের কাছে আকাশচুম্বী।

মন্তব্য করুন