রেকর্ড ফলনের পরও পেঁয়াজ আমদানির কারণ

প্রকাশ: শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ
রেকর্ড ফলনের পরও পেঁয়াজ আমদানির কারণ

অর্থনীতি প্রতিবেদক: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সর্বশেষ তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ পরিমাণ পেঁয়াজ ঘরে তুলেছেন বাংলাদেশের কৃষকরা। তবে উৎপাদনের এই অভাবনীয় সুসময়েও দেশের পেঁয়াজ চাষিদের মনে বিন্দুমাত্র স্বস্তি নেই। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল ফরিদপুরের সালথাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকদের চরম ক্ষোভ, হতাশা ও অসহায়ত্বের চিত্র সামনে আসছে, যেখানে উৎপাদন খরচের অর্ধেকেরও কম দামে বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। এমনকি ন্যায্য মূল্য না পেয়ে ক্ষোভে অনেক কৃষককে নিজেদের কষ্টার্জিত পেঁয়াজ খাল, পুকুর বা ডোবার পানিতে ফেলে দিতেও দেখা গেছে।

সরেজমিনে দেশের বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। কোনো কোনো অঞ্চলে এই দর নেমে এসেছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়। অথচ কৃষকদের দাবি, সার, বীজ ও শ্রমিকের মজুরিসহ প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে তাঁদের ন্যূনতম খরচ হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা।

নথি অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ ঘাটতি মেটাতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর গত বছর ভারত থেকে ১ হাজার ৫০০ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিয়েছিল। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৪ লাখ ৮৩ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। দেশে রেকর্ড উৎপাদনের পরও কেন এই আমদানির চক্র থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না—তা নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং বাজার বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি বড় কাঠামোগত সমস্যা দায়ী:

১. আধুনিক সংরক্ষণাগারের তীব্র অভাব: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের একটি বড় অংশই হলো ‘মুড়িকাটা’ বা আগাম জাতের, যা বেশিদিন টিকিয়ে রাখা যায় না। আর মূল মৌসুমের ‘হালি’ পেঁয়াজ দীর্ঘ মেয়াদে সংরক্ষণের জন্য দেশে আধুনিক বা নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার কোল্ড স্টোরেজ বা বিশেষায়িত হিমাগার নেই বললেই চলে। কৃষকরা বাধ্য হয়ে চিরাচরিত পদ্ধতিতে ঘরের সিলিংয়ে বা বাঁশের মাচায় পেঁয়াজ রাখেন। ফলে আর্দ্রতা ও অতিরিক্ত গরমে প্রতি বছর মোট উৎপাদনের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে কাগজে-কলমে দেশ উদ্বৃত্ত থাকলেও বাস্তবে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়।

২. অকাল আবহাওয়া ও বাজার সিন্ডিকেট: প্রাকৃতিক কারণ যেমন অকাল বৃষ্টি, অতি খরা বা সঠিক ওজনের অভাবে বাজারে অনেক সময় সময়মতো পেঁয়াজ আসে না। আর এই সুযোগটিকে কাজে লাগায় বড় আড়তদার ও ব্যাপারীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কম দামে কৃষকের কাছ থেকে পেঁয়াজ কিনে মজুদ করে ফেলে এবং পরবর্তীতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেয়। তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে বাধ্য হয়ে আমদানির অনুমতি দিতে হয়।

সংকট উত্তরণে সরকারি উদ্যোগ: এই আমদানির চক্র এবং কৃষকের লোকসান ঠেকাতে সরকার ও কৃষি গবেষকরা কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ও গ্রীষ্মকালীন জাত ‘বারি পেঁয়াজ-৫’ চাষে জোর দেওয়া হচ্ছে, যা বর্ষা ও গরমেও চাষ উপযোগী। সরকার বর্তমানে কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার এবং পলিথিনসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ দিচ্ছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল এবং যশোর-পাবনা অঞ্চলে এই আবাদ প্রতি বছর দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (মনিটরিং) ড. মো. আবু জাফর আল মনসুর এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এবার পেঁয়াজের রেকর্ড ফলন হয়েছে। দেশীয় কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় এখন আমদানি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি এবং সরকার যাতে আর কোনো পেঁয়াজ আমদানি না করে, সে বিষয়ে আমরা জোরালো সুপারিশ করেছি।’

পেঁয়াজ সংরক্ষণের আধুনিকায়ন নিয়ে কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, এয়ার-ফ্লো মেশিন স্থাপনের মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ ও রসুন বিজ্ঞানসম্মতভাবে সংরক্ষণের জন্য একটি আধুনিকায়ন ও বিতরণ কার্যক্রম উন্নয়ন শীর্ষক নতুন প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটি বর্তমানে পর্যালোচনার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাসউদুল হক ঝন্টু জানান, পেঁয়াজের ২২টি ফেনোটাইপ নিয়ে বর্তমানে গবেষণা চলছে এবং প্রতি বছর উৎপাদন ৭ থেকে ১২ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব কামরুল হাসান এ বিষয়ে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘কৃষকরা পেঁয়াজের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না এবং তাঁরা ক্ষতির মুখে আছেন, এটি আমরা জানি। এই অবস্থায় নতুন করে আমদানির কোনো সুযোগ নেই। আমরা দেশীয় উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করে পেঁয়াজ আমদানি পুরোপুরি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে কাজ করছি।’

মন্তব্য করুন