সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যায় বগুড়া শহর, জলাবদ্ধতায় নাকাল নগরবাসী
ওয়াফিক শিপলু, বগুড়া প্রতিনিধি: বগুড়াকে উন্নত নগর সেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হলেও এর বাস্তব চিত্র যেন সম্পূর্ণ বিপরীত। সামান্য বৃষ্টিতেই এখন উত্তরবঙ্গের এই প্রধান শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। জলাবদ্ধতায় স্থবির হয়ে পড়ছে স্বাভাবিক জনজীবন, যার ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নিয়মিত নালা পরিষ্কার না করাকেই এই অন্তহীন দুর্ভোগের মূল কারণ বলে মনে করছেন ক্ষুব্ধ নগরবাসী।
গত সোমবার সকাল থেকে কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতেই শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা, কবি নজরুল ইসলাম সড়ক, শেরপুর রোড, স্টেশন রোড, পার্ক রোড, খান্দার, গালাপট্টি, টেম্পল রোড, ফতেহ আলী বাজার, কাটনারপাড়া ও মালতীনগরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে যায়। অনেক স্থানে সড়ক ও ড্রেন উপচে একাকার হয়ে যাওয়ায় সাধারণ পথচারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হন। জলাবদ্ধতার কারণে ছোট ছোট যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শহরের প্রধান পয়েন্টগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে একটি গণমাধ্যমকে জানান, প্রায় দুই দশক ধরে শহরের এই একই চিত্র চলছে। বর্ষা এলেই শহরটি যেন এক অপূর্ণাঙ্গ জলাবদ্ধতার নগরীতে পরিণত হয়। শহরের নালাগুলো অত্যন্ত সরু, অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত এবং দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার কোনো পথ পায় না। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি জমে থাকে।
এই কৃত্রিম বন্যার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও রোগী বহনকারী জরুরি যানবাহনের যাত্রীরা। শহরের ফতেহ আলী বাজার ও গালাপট্টি এলাকার অনেক দোকান এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দুর্গন্ধযুক্ত নোংরা পানি ঢুকে পড়ায় ব্যবসায়ীদের বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। নোংরা ও দূষিত পানিতে দিনের পর দিন চলাচল করতে গিয়ে স্থানীয়দের মাঝে চর্মরোগসহ বিভিন্ন ধরণের স্বাস্থ্যঝুঁকিও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই নগরে বর্তমানে প্রায় ৯৯১ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৫৫ কিলোমিটার সড়কই কাঁচা। সিটি করপোরেশনের ২১টি ওয়ার্ডে ড্রেনের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৯০০ কিলোমিটার হলেও এর একটি বিশাল অংশ অত্যন্ত পুরোনো, ভাঙাচোরা ও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে অনেক ড্রেনের পানি ধারণ ও নিষ্কাশন ক্ষমতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
এই সার্বিক বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বগুড়া সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক এমরাত ইসলাম স্বাধীন একটি গণমাধ্যমকে জানান, ড্রেনেজ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে তারা মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন। তবে বর্তমান বর্ষা মৌসুমে মাটি কাটা বা বড় ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। আগামী বছরের মধ্যে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় সব ধরনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রশাসনের এমন চেনা আশ্বাসের পরও নগরবাসীর মনে প্রশ্ন—প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি আর কতদিন সহ্য করতে হবে? উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি কেবল কাগজে-কলমে না রেখে কবে বাস্তবে রূপ নেবে? এখন বগুড়াবাসীর একটাই জোরালো দাবি, দ্রুত কার্যকর ও আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলে এই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা হোক।
|