ইতালির স্বপ্নে লিবিয়ায় নিখোঁজ মাদারীপুরের সাইদুল: ৩৯ লাখ টাকা খুইয়ে নিঃস্ব পরিবার

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪৭ অপরাহ্ণ
ইতালির স্বপ্নে লিবিয়ায় নিখোঁজ মাদারীপুরের সাইদুল: ৩৯ লাখ টাকা খুইয়ে নিঃস্ব পরিবার
নিখোঁজ সাইদুল বেপারীর ফেরার অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের আহাজারি

নাজমুল হাসান, মাদারীপুর প্রতিনিধি: ঘরের দরজা খুললেই হয়তো ছেলে ফিরে আসবে—এই আশায় প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন মা সূর্যবান বেগম। কখনো চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন, কখনো পাশে বসে কাঁদেন। আবার কখনো নীরবে চোখের পানি মুছে মনে মনে প্রশ্ন করেন, ‘আমার ছেলে কোথায়? কেমন আছে? খেয়েছে তো?’

দুই মাস ধরে এমনি এক চরম অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের ঘটকচর দত্তের হাট এলাকার সূর্যবান বেগমের। ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো তাঁর ছেলে সাইদুল বেপারী (৩২) এখন লিবিয়ায় নিখোঁজ। তাঁর কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পুরো পরিবার দিশেহারা।

সরেজমিনে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সাইদুলের ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে তাঁর পুরো পরিবার। শুধু মা নন, স্বামী ও বাবার অপেক্ষায় রয়েছেন সাইদুলের স্ত্রী মেরি আক্তার, চার বছরের মেয়ে ও ১১ মাসের এক কোলের শিশুসহ অন্য স্বজনরা।

পরিবারের অভিযোগ, সাইদুলকে বিদেশে পাঠাতে সহায়-সম্পত্তি ও জমানো জমিজমা বিক্রি করা হয়েছে। পাশাপাশি এনজিও থেকে ঋণ ও স্থানীয়ভাবে চড়া সুদেও টাকা নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা খরচ হলেও সাইদুলের কোনো সন্ধান মিলছে না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মা সূর্যবান বেগম বলেন, “আমার ছেলে কোথায় আছে, কেমন আছে, কিছুই জানি না। প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকি, মনে হয় এই বুঝি আমার ছেলে এসে ডাকবে। আমি আমার ছেলেকে বুকের মধ্যে ফিরে পেতে চাই।”

বাবার ফেরার অপেক্ষায় থাকা চার বছরের শিশুটি প্রায়ই মায়ের হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে বাবার সঙ্গে কথা বলতে চায়। কিন্তু ফোনের ওপাশ থেকে কোনো সাড়া মেলে না। অবুঝ শিশুটি তখন কেঁদে ওঠে। অন্যদিকে ছোট ছেলেটি বুঝতেই পারছে না কেন তার বাবা নেই। কোলে ছোট সন্তানকে নিয়ে মেরি আক্তার দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন কীভাবে তিনি সন্তানদের মানুষ করবেন।

স্বজন মাহিদুল বেপারীর অভিযোগ, ঘটকচর এলাকার মৃত বাদশা ফরাজীর ছেলে আনোয়ার ফরাজী ২৩ লাখ টাকার বিনিময়ে সাইদুলকে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখান। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৬ মে অগ্রিম ১২ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে একই বছরের ৯ জুন শ্রীলঙ্কা ও দুবাই হয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে সাইদুলকে নেওয়া হলেও তাঁকে সুকৌশলে লিবিয়ায় পাচার করা হয়।

পরিবারের দাবি, লিবিয়ায় নেওয়ার পর সাইদুলকে একটি স্থানীয় চক্রের জিম্মায় আটকে রাখা হয়। নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্টসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ধাপে ধাপে পরিবারের কাছ থেকে মোট প্রায় ৩৯ লাখ টাকা আদায় করা হয়। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও গত দুই মাস ধরে সাইদুলের সঙ্গে পরিবারের সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

স্থানীয়ভাবে একাধিকবার বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে গত ১১ সেপ্টেম্বর সাইদুলের বড় ভাই সামাদ হোসেন বাদী হয়ে আনোয়ার ফরাজী, শিল্পী আক্তার, বাদল জমাদ্দার, সাহেব আলী জমাদ্দার, মামুন বেপারী, ইভা বেগম ও ছলে বেগম—এই সাতজনকে অভিযুক্ত করে ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনাল, মাদারীপুরে’ একটি মামলা দায়ের করেন।

এদিকে অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি তাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিইনি।” তবে তাঁর স্ত্রী শিল্পী আক্তার টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করলেও অংকটি ১৯ লাখ টাকা বলে দাবি করেন।

এ বিষয়ে মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ জানান, সাইদুল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবার আদালতে মামলা করেছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। আদালতের নির্দেশনা থানায় পৌঁছানোর পর নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে দ্রুত জড়িতদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য করুন