এআই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে কি চাপে ফেলছে চীন
প্রযুক্তি প্রতিবেদক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে বিশ্বরাজনীতির দুই প্রধান পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার প্রযুক্তিগত স্নায়ুযুদ্ধ চলতি ২০২৬ সালে এসে এক নতুন ও অত্যন্ত জটিল সমীকরণে রূপ নিয়েছে। বছরের শুরুতে চীনা এআই প্রতিষ্ঠান ‘ডিপসিক’ (DeepSeek)-এর ‘আর-ওয়ান’ (R-1) মডেল যেখানে মার্কিন প্রযুক্তি বাজারের একচেটিয়া শেয়ারমূল্যে ধস নামিয়েছিল, সেখানে সম্প্রতি আরেক চীনা টেক জায়ান্ট ‘জেড.এআই’ (Z.AI)-এর নতুন মডেলের আত্মপ্রকাশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিয়েছে। বৈশ্বিক প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব এখন স্পষ্টভাবে মেনে নিতে শুরু করেছে যে, এআই প্রযুক্তির অত্যাধুনিক উদ্ভাবন ও এর প্রায়োগিক সক্ষমতায় চীন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হয়ে উঠছে।
চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র: কৌশলের ভিন্নতা ও ওপেন-সোর্স নীতি
এআই প্রযুক্তির এই মহাযুদ্ধে দুই পরাশক্তির করপোরেট ও রাষ্ট্রীয় কৌশলে এক বিশাল বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে:
চীনা কৌশল (Open-Source): চীনের এআই প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তাদের তৈরি করা সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেলগুলো সম্পূর্ণ উন্মুক্ত বা ‘ওপেন-সোর্স’ হিসেবে উন্মোচন করে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে যেকোনো ডেভেলপার বা সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই মডেলগুলো ডাউনলোড করে নিজস্ব লোকাল সার্ভারে চালাতে পারেন।
মার্কিন কৌশল (Closed-Source): অপরদিকে, ওপেনএআই (OpenAI) বা মাইক্রোসফটের মতো শীর্ষ মার্কিন জায়ান্টগুলো তাদের উদ্ভাবিত মডেলের ভেতরের সোর্স কোড বা মূল কাঠামো সম্পূর্ণ গোপন রাখে। তারা মূলত নিজস্ব ক্লাউডভিত্তিক অবকাঠামোতে মডেল সংরক্ষণ করে এবং চড়া মূল্যের সাবস্ক্রিপশন বা এপিআই (API) ফি-এর বিনিময়ে তা ব্যবহারের সুবিধা দেয়।
যদিও চীনের এই উন্মুক্ত মডেলগুলো সব ক্ষেত্রে মার্কিন প্রিমিয়াম ক্লাউড মডেলের সমমানের নয়, তবে সাধারণ ব্যবহারকারী এবং উদীয়মান ডেভেলপারদের একটি বড় অংশই এখন চীনা মডেলের দিকে ঝুঁকছেন। যুক্তরাজ্যের এক সফটওয়্যার ডেভেলপার জানান, জেড.এআই-এর মডেলটি স্থানীয়ভাবে চালাতে ৩০ শতাংশ বেশি সময় নিলেও তা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা যাচ্ছে, যা নতুন স্টার্টআপগুলোর জন্য বিশাল আর্থিক সাশ্রয় এনে দিচ্ছে।
পরিসংখ্যানে চীনের আধিপত্য
এআই মূল্যায়নকারী বিশ্ববিখ্যাত প্ল্যাটফর্ম ‘ওপেনরাউটার’ (OpenRouter)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এআই ব্যবহারের বিশ্ববাজারে চীনা মডেলগুলোর অবস্থান এখন আকাশচুম্বী।
বিশ্বের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত এআই মডেলের শীর্ষ তালিকার চিত্রটি নিচে তুলে ধরা হলো:
| বৈশ্বিক অবস্থান | মডেলের নাম ও ধরণ | উৎস দেশ |
| ১ম | ডিপসিক বা DeepSeek (সর্বশেষ সংস্করণ) | চীন |
| ৫ম | জিএলএম-৫.২ বা GLM-5.2 (জেড.এআই) | চীন |
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি বহুল ব্যবহৃত এআই মডেলের মধ্যে ৭টিই এককভাবে চীনা প্রতিষ্ঠানের দখলে। এআই মূল্যায়নকারী বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান 'আর্টিফিশিয়াল অ্যানালাইসিস' ইতিমধ্যেই জেড.এআই-এর জিএলএম-৫.২-কে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বুদ্ধিমান উন্মুক্ত এআই মডেল হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। এমনকি জেড.এআই-এর দাবি, জটিল সফটওয়্যার প্রকৌশল সংক্রান্ত একটি কঠিন পরীক্ষায় তাদের উদ্ভাবিত মডেলটি ওপেনএআইয়ের জিপিটি-৫.৫ (GPT-5.5)-কেও সক্ষমতায় ছাড়িয়ে গেছে।
ভূরাজনীতি, নিষেধাজ্ঞা ও ৬০ ট্রিলিয়ন পাউন্ডের ভবিষ্যৎ
যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ডেভিড শ্রায়ারের মতে, ভবিষ্যতের বৈশ্বিক এআই বাজারের আকার প্রায় ৬০ ট্রিলিয়ন পাউন্ড হতে পারে। তবে এই বিশাল অর্থনৈতিক মূল্যের চেয়েও এর ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। সংবেদনশীল ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বিষয়ে চীনা ও মার্কিন এআই মডেলগুলোর দেওয়া উত্তর বা দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিপরীতমুখী হয়, যা আগামী দিনে বিশ্বমতের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।
বেইজিংকে থামাতে ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে চীনের কাছে অত্যাধুনিক এআই চিপ (যেমন এনভিডিয়া চিপ) রপ্তানিতে কঠোর ও একমুখী বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফিলিপ টর সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি উন্নত এআই প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক প্রবেশাধিকার আরও সীমিত বা ব্লক করে, তবে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। অতীতে হুয়াওয়ের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় তারা যেমন মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব চিপ ও ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে, চীন এআই খতিয়ানেও ঠিক তা-ই করছে। মূলত পশ্চিমা মডেলগুলো নিবিড় বিশ্লেষণ করেই চীন নিজেদের প্রযুক্তির সক্ষমতা হু হু করে বাড়িয়ে তুলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট দুর্গ ও ইউরোপের উদ্বেগ
অবশ্য বৈশ্বিক করপোরেট বাজারে মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো এখনো বেশ সুবিধাজনক ও নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। মাইক্রোসফট বা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা নীতি, কঠোর ডাটা প্রাইভেসী এবং দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক আইনি নিয়ম মেনে চলার দারুণ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করা উন্মুক্ত চীনা মডেলে ডেটা চুরি বা সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকায় বিশ্বের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো মার্কিন ক্লাউড সেবা ও অফিশিয়াল সফটওয়্যার ব্যবহারের ওপরই পূর্ণ আস্থা রাখছে।
তবে এই দুই পরাশক্তির এআই যুদ্ধের ডামাডোলে সবচেয়ে বেশি অস্তিত্বের ঝুঁকিতে পড়েছে ইউরোপ মহাদেশ। অক্সফোর্ডের ফিলিপ টর এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, ইউরোপ যদি এখনই নিজস্ব শক্তিশালী এআই অবকাঠামো ও পরাশক্তি গড়ে তুলতে না পারে, তবে অদূর ভবিষ্যতে তারা সম্পূর্ণভাবে অন্য দেশের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল এক আধুনিক ডিজিটাল উপনিবেশে পরিণত হবে।
|