রাশিয়ার তেল কিনলে ভারতসহ ৫ দেশের ওপর মার্কিন শুল্কের নতুন বিল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কেনা দেশগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে শায়েস্তা করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে একটি অত্যন্ত কঠোর ও কৌশলগত নিষেধাজ্ঞা বিল উত্থাপন করা হয়েছে। এই প্রস্তাবিত বিলটি আইনে পরিণত হলে, রাশিয়ার তেল কেনা জারি রাখার অপরাধে দক্ষিণ এশিয়ার পরাশক্তি ভারতসহ বিশ্বের প্রধান ৫টি দেশকে অতিরিক্ত শাস্তিমূলক শুল্ক ও অন্যান্য মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধের মুখোমুখি হতে হবে।
গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ওয়াশিংটনে মার্কিন সিনেটের প্রভাবশালী সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল, জিন শাহিন, রজার উইকার এবং কেটি ব্রিটসহ ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান— উভয় দলের একঝাঁক শীর্ষ আইনপ্রণেতা যৌথভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিলটি সিনেটে উত্থাপন করেন।
বিশ্ব রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের রাশিয়া-বিরোধী ও মার্কিন সিনেটের প্রয়াত প্রভাবশালী সদস্য লিন্ডসে গ্রাহামের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই বিলটির নামকরণ করা হয়েছে ‘লিন্ডসে গ্রাহাম রাশিয়া অ্যাকাউন্টেবিলিটি বিল’। মৃত্যুর আগে গ্রাহাম ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এই শুল্ক নীতির খসড়া নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছিলেন বলে জানা গেছে।
পূর্ববর্তী খসড়াগুলোতে প্রায় ৬৩টি দেশের ওপর শুল্ক আরোপের ঢালাও প্রস্তাব থাকলেও, বর্তমান চূড়ান্ত বিলে লক্ষ্যবস্তু সুনির্দিষ্ট করে মাত্র ৫টি প্রধান ক্রেতা দেশকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। মার্কিন সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল যে ৫টি দেশের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, সেগুলো হলো: ১. চীন ২. ভারত ৩. স্লোভাকিয়া ৪. হাঙ্গেরি ৫. আজারবাইজান
হোয়াইট হাউসের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিলটিকে নীতিগতভাবে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। বিলটি মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে (সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ) পাস হওয়ার পর ট্রাম্পের স্বাক্ষরে আইনে পরিণত হলে, মার্কিন প্রশাসন রাশিয়ার জ্বালানি খাতের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শাস্তিমূলক শুল্ক (Punitive Tariff) আরোপের একচ্ছত্র আইনি ক্ষমতা পাবে।
শুল্কের সুনির্দিষ্ট হার মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (USTR) পরবর্তীতে নির্ধারণ করবেন। তবে সিনেটর ব্লুমেনথাল সাফ জানিয়েছেন, শুল্কের পরিমাণ এমন স্তরে নিয়ে যাওয়া হবে যাতে ভারত ও চীনের মতো দেশগুলো রাশিয়ার কাছ থেকে তেল-গ্যাস আমদানি করতে সম্পূর্ণ নিরুৎসাহিত হয়।
সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক কমিটির চেয়ারম্যান জেমস রিশ রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ (Shadow Fleet) বা গোপন ও নামহীন ট্যাংকার বহরের বিরুদ্ধে মার্কিন নৌবাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ, রাশিয়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এই ছদ্মবেশী ট্যাংকারগুলোর মাধ্যমেই সমুদ্রে তেল পাচার ও রপ্তানি সচল রেখেছে।
তবে এই বিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্রদের জন্য কিছুটা স্বস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যেসব দেশ রাশিয়া থেকে মোট চাহিদার ১৫ শতাংশের কম প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে এবং পর্যায়ক্রমে তা কমিয়ে আনছে, তারা এই বিধিনিষেধের আওতার বাইরে থাকবে। ফলে ইউরোপের বেশিরভাগ ন্যাটো (NATO) মিত্র দেশ এই মারাত্মক শুল্ক থেকে রেহাই পাবে।
বর্তমানে রাশিয়া থেকে আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে অনেক কম মূল্যে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত ক্রুড অয়েল আমদানি করছে ভারত। এই বিষয়ে দিল্লির সাউথ ব্লকের পক্ষ থেকে বরাবরই জানানো হয়েছে যে, ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দেশের বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এই আমদানি সচল রাখা প্রয়োজন।
মার্কিন আইনপ্রণেতারা আশা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী আগস্টের শেষের আগেই বিলটি সিনেটে পাস করানো সম্ভব হবে। তবে বিলটি আইনে পরিণত হলে তা ওয়াশিংটন-দিল্লি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরাতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বিশ্লেষকেরা।
|