ছয় মাসে বিএনপির ৩৮ নেতাকর্মী নিহত, কারণ নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য

প্রকাশ: শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৫ পূর্বাহ্ণ
ছয় মাসে বিএনপির ৩৮ নেতাকর্মী নিহত, কারণ নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য

অনলাইন ডেস্ক: চলতি বছরের বিগত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘটে যাওয়া পৃথক রাজনৈতিক ও সামাজিক সহিংসতার ঘটনায় বিরোধী বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের অন্তত ৩৮ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে স্থানীয় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, পূর্বশত্রুতা, চাঁদাবাজি, ফুটপাত দখল এবং বিভিন্ন বেআইনি অর্থনৈতিক খাতের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।

পাশাপাশি একই সময়কালে দেশে সামগ্রিক অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের হারও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন—এই চার মাসে সারাদেশে মোট ১ হাজার ৯১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

অন্যদিক, মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক)-এর প্রদত্ত তথ্য বলছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত নিহত ৩৮ জন নেতাকর্মীর পরিচয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে—এদের মধ্যে মূল দল বিএনপির ২১ জন, যুবদলের ৮ জন, ছাত্রদলের ২ জন, শ্রমিক দলের ২ জন, কৃষক দলের ২ জন, স্বেচ্ছাসেবক দলের ২ জন এবং তাঁতি দলের ১ জন সদস্য রয়েছেন।

সর্বশেষ গত ২৪ জুলাই রাতে রাজধানীর কাফরুলে সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারান যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ আলী পারভেজ। গোয়েন্দা সংস্থা ডিবি জানায়, কাফরুল থানা যুবদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ময়লার দরপত্র, ফুটপাতের দোকান ও বাড়ি দখল নিয়ে বিরোধের জেরে সদস্যসচিবকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২৫ লাখ টাকায় ঝিনাইদহ থেকে ভাড়াটে শ্যুটার আনা হয়েছিল। তবে লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলিতে নিহত হন নিরীহ কর্মী পারভেজ। এ ঘটনায় অস্ত্রসহ ৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এর আগে ২১ জুলাই রাজধানীর সবুজবাগে ওয়ার্ড বিএনপি কর্মী ইব্রাহিম পলাশকে কুপিয়ে হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করা হয়, যার পেছনেও স্থানীয় যুবদলের একাংশের নাম উঠে আসে। ১৫ জুলাই কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে উপজেলা বিএনপির স্থগিত সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে কুপিয়ে হত্যা করে স্থানীয় এক ছাত্রদল নেতার ভাড়াটে চক্র। একই ধরনের দখল-বাণিজ্যের জেরে গত ৮ জুন রাজধানীর মৌচাকে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বিল্লাল হোসেনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।

অধিকার বিষয়ক সংস্থা 'হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি' (এইচআরএসএস) জানিয়েছে, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত তিন মাসে দেশে অন্তত ৬১০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে নিহত হন ৩৬ জন। এর মধ্যে সিংহভাগ সংঘর্ষই ঘটেছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গ্রুপ ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে।

এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় অপরাধী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পরিকল্পিত হামলার শিকার হচ্ছেন দলটির নিষ্পাপ নেতাকর্মীরা। এসব ঘাতক ও অপরাধীদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর আইনি শাস্তির আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনা যেটাই হোক না কেন, আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তিনি নিশ্চিত করেন, নিহতদের অধিকাংশ ঘটনার পেছনেই স্থান ভিত্তিক ময়লা-বাণিজ্য, ফুটপাত দখল ও চাঁদা আদায়ের নেপথ্য বিরোধ জড়িত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানী ও সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের শিক্ষক তৌহিদুল হক মনে করেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ফুটপাত, পরিবহন ও ড্রেজিং বাণিজ্যের মতো বেআইনি আয়ের উৎসগুলো বন্ধ করতে না পারলে এবং নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত না করা গেলে এই সহিংসতা বন্ধ করা অসম্ভব।

মন্তব্য করুন