ডিজিটাল নজরদারিতে বৃক্ষরোপণ, আসছে ট্রি মনিটরিং অ্যাপ
জাতীয় প্রতিবেদক: সরকারের দেশব্যাপী নেওয়া বিশাল বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, বিশেষ করে ‘একটি শিশু, এক বৃক্ষ’ প্রজেক্টের আওতায় রোপণ করা লাখো চারার টিকে থাকা, সার্বিক বৃদ্ধি এবং মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবার আধুনিক প্রযুক্তির ‘ট্রি মনিটরিং অ্যাপ’ তৈরি করা হচ্ছে।
জাতীয় সবুজ মিশনের অংশ হিসেবে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারের লক্ষ্যে সদ্য প্রণীত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের (এফওয়াই২৭) জাতীয় বাজেট বক্তৃতা এবং বাংলাদেশ জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদন ২০২৬-২৭-এ সরকারের এই যুগান্তকারী উদ্যোগের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি বাজেট ও জলবায়ু নীতিসংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য দলিল অনুযায়ী, দেশজুড়ে রোপণ করা গাছের ধারাবাহিক ডিজিটাল নজরদারি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার মাধ্যমে সামগ্রিক বনায়ন কার্যক্রমকে আরো আধুনিক, স্বচ্ছ ও সর্বসাধারণের কাছে জবাবদিহিমূলক করতে এই বিশেষ অ্যাপটি তৈরি করা হচ্ছে। এই ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে যেকোনো চারার বর্তমান অবস্থা খুব সহজেই পর্যবেক্ষণ করা যাবে এবং রোপণের পর তার যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে ‘একটি শিশু, একটি বৃক্ষ’ কর্মসূচির আওতায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাড়ি ও বসতভিটায় রোপণ করা বিপুল সংখ্যক গাছের তাৎক্ষণিক নজরদারির জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই অ্যাপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য, দেশের সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সরাসরি সম্পৃক্ত করে তাদের নিজ নিজ বাড়ি ও বসতভিটায় প্রাথমিক ধাপে ১ কোটি গাছ রোপণের লক্ষ্য নিয়ে ‘একটি শিশু, একটি বৃক্ষ’ কর্মসূচি দেশজুড়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের অবুঝ মনের মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সুরক্ষার অনন্য দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা।
বন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এই ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরো নিখুঁত ও আধুনিক করতে ট্রি মনিটরিং অ্যাপকে সরাসরি জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) এবং জিআইএস (জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম) ভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ কাঠামোর সঙ্গে সমন্বিত করা হবে। এর সুবাদে বন অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় সার্ভারে বনায়নকৃত এলাকার সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল মানচিত্র ও বিশাল তথ্যভান্ডার (ডাটাবেজ) সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বৃক্ষরোপণ এলাকাগুলোতে, যেখানে সরাসরি গিয়ে নিয়মিত তদারকি করা প্রশাসনিকভাবে বেশ কঠিন, সেখানে চারার শতভাগ টিকে থাকা নিশ্চিত করতে এই অ্যাপটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করবে।
বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় সবুজ মিশনের দূরদর্শী পরিকল্পনার আওতায় আগামী পাঁচ বছরে দেশব্যাপী মোট ২৫ কোটি গাছ রোপণের এক মহৎ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অবক্ষয়িত বা উজাড় হওয়া বন পুনরুদ্ধার, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং বায়ুমণ্ডলের ক্ষতিকারক কার্বন শোষণ সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। শুধু তাই নয়, বৃহত্তর এই পরিবেশবান্ধব বনায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষের জন্য নতুন ‘সবুজ কর্মসংস্থান’ (গ্রিন জবস) সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে সরকার।
ঘোষিত বাজেট দলিল অনুযায়ী, পরিবেশ সংরক্ষণ ও দেশের জাতীয় আয় বৃদ্ধির আরেকটি অভিনব অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হিসেবে উপকূলীয় অঞ্চলের ম্যানগ্রোভ বনের প্রায় ৫০ শতাংশ এলাকাকে বৈশ্বিক কার্বন বাণিজ্য (কার্বন ক্রেডিট) ব্যবস্থার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বনায়ন কর্মসূচিতে উপকূলীয় অঞ্চলের নতুন জেগে ওঠা চরাঞ্চলে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ রোপণ, পাহাড়ি ও মধ্যাঞ্চলের শালবন পুনরুদ্ধার এবং দেশের বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় বনজ প্রজাতি সংরক্ষণের ওপর বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে দেশের চিরচেনা জীববৈচিত্র্য চিরতরে সুরক্ষিত থাকে।
|