রাজশাহীতে আঙ্গুরের বাণিজ্যিক চাষ, সফলতায় নতুন স্বপ্ন দেখছেন চাষিরা
মো: গোলাম কিবরিয়া, রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি: স্ট্রবেরি, মাল্টা ও ড্রাগনের পর এবার রাজশাহীতে শুরু হয়েছে আঙ্গুরের বাণিজ্যিক চাষ। জেলার আবহাওয়ায় এই ফল সুমিষ্ট ও টসটসে হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে আঙ্গুর বাগানের পরিধি, আগ্রহী হচ্ছেন তরুণ কৃষকরা। চাষিদের লোকসান কমিয়ে বাণিজ্যিক সাফল্য নিশ্চিত করতে সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
সবুজের সতেজতার মাঝে থোকায় থোকায় ঝুলছে আঙ্গুর। কোনটা খয়েরি, কোনটা সবুজ আবার কোনটা কালচে রঙের। প্রতিটি থোকাই রসে ভরপুর। এমন নজরকাড়া দৃশ্য দেখা গেছে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার হাসনিপুর গ্রামের তরুণ চাষি ইমাম হোসেন সাগরের আঙুর বাগানে। তার ৩ বিঘার বাগানে রয়েছে বাইকুনুর, অ্যাপোলো, দাসুনিয়া ও অস্ট্রেলিয়ান কিং-সহ উচ্চফলনশীল ৮টি জাতের আঙ্গুর।
উদ্যোক্তা ও পেশায় প্রকৌশলী ইমাম হোসেন সাগর গণমাধ্যমকে জানান, যশোরের একটি বাগানে তিন বিঘা জমিতে প্রচুর আঙুরের ফলন দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি, তার বাবা ও ছোট ভাই মিলে এই বাগানটি তৈরি করেন। দুই বিঘা জমি দিয়ে শুরু করা এই প্রজেক্টে তাদের প্রাথমিক বিনিয়োগ ছিল প্রায় ৫ লাখ টাকা।
চলতি মৌসুমে বাগানের ৩৬০টি গাছ থেকে এই কৃষক প্রায় ৭ হাজার ২১ কেজি আঙ্গুর সংগ্রহ করেছেন, যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ২১ লাখ টাকা। সাগরের মতো জেলার তিনটি উপজেলায় এখন প্রায় ৩০ জন চাষি ৩ হেক্টর জমিতে আঙ্গুরের আবাদ করছেন। তাদের এই অভাবনীয় সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে জেলার অন্য কৃষকরাও বাগান করার স্বপ্ন বুনছেন। প্রতিদিন এই নতুন ধরনের ফল বাগান দেখতে ভিড় করছেন দর্শনার্থী ও নতুন উদ্যোক্তারা।
বাগান দেখতে আসা এক নতুন চাষি একটি গণমাধ্যমকে বলেন, "আমাদের এলাকার মাটিতে কেমন ফলন হবে তা পরীক্ষা করার জন্য পরীক্ষামূলকভাবে দু-তিনটা চারা নিয়ে যাব। যদি দেখি ভালো হচ্ছে, তাহলে আমরাও বাণিজ্যিকভাবে এই আঙ্গুর চাষ শুরু করার চিন্তাভাবনা করছি।"
চাষিরা জানান, আঙুর উৎপাদনের পাশাপাশি এখন বাগানগুলো থেকে চারাও উৎপন্ন হচ্ছে। গত এক বছরে গাছের কাটিং বা ছেঁটে ফেলা ডাল থেকে তৈরি হয়েছে শত শত উন্নত জাতের চারা। প্রতি পিস চারা মানভেদে ২৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ফলে কেবল চারা বিক্রি করেই বছরে চাষিদের আয় হচ্ছে অন্তত ১৫ লাখ টাকা। চারা বিক্রির সাথে জড়িত একজন কর্মী গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, "ইতিমধ্যেই আমাদের অনেক চারা বিক্রি হয়ে গেছে এবং নতুন প্রচুর অর্ডার আছে। অল্পদিনের মধ্যেই এই মৌসুমের চারা শেষ হয়ে যাবে।"
এর আগে রাজশাহীর চাষিরা বিচ্ছিন্নভাবে চেষ্টা করলেও আঙ্গুর চাষে আশানুরূপ ফলাফল পাননি। তবে এবার আবহাওয়ার উপযোগিতা যাচাই এবং আধুনিক পলিশেড হাউস প্রযুক্তির ব্যবহারে দারুণ সাফল্য আসায় কৃষকদের আগ্রহ বহুগুণ বেড়েছে। সফল বাণিজ্যিক উৎপাদনের লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ে বহুমুখী সহায়তা বাড়িয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরও।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন একটি গণমাধ্যমকে জানান, রাজশাহী জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ৩ হেক্টর জমিতে আঙুরের চাষ হচ্ছে এবং এই চাষের সঙ্গে প্রায় ৩০ জন কৃষক সরাসরি জড়িত। তিনি বলেন, "এই আবাদটা যদি আমরা আরও বাড়াতে পারি এবং স্থানীয় বাজারটা ধরতে পারি, তাহলে বাইরে থেকে আমাদের আঙ্গুর আমদানির নির্ভরতা অনেকটাই কমে যাবে।"
উদ্যোক্তাদের মতে, একটি আঙ্গুর গাছের জীবনকাল অন্তত ৩০ বছর হয়ে থাকে। সেই তুলনায় এর পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ খুবই কম, কিন্তু লাভের পরিমাণ অনেক বেশি। সঠিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে রাজশাহীতে আঙুর চাষের পরিধি আরও দ্রুত সম্প্রসারিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
|