৪০০০ কিমি পাড়ি দিয়ে তেহরানে মাজিয়া
অনলাইন ডেস্ক: ইরানের সদ্য প্রয়াত ও সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সুদূর যুক্তরাজ্য (ইউকে) থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটারের দীর্ঘ আকাশপথ পাড়ি দিয়ে রাজধানী তেহরানে ফিরেছেন মাজিয়া নামে এক ইরানি নারী। তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কারণে নয়, বরং শুধুমাত্র দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে প্রিয় নেতার বিদায় অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্যই তিনি স্বদেশে ছুটে এসেছেন।
আজ সোমবার (৬ জুলাই) তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড মোসাল্লা অভিমুখে যাওয়ার পথে গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আমি আজ বিশ্ববাসীকে স্পষ্ট করে জানাতে এসেছি যে, ইরানের ৪ হাজার বছরের পুরোনো একটি গৌরবময় সভ্যতাকে বাইরের কোনো শক্তি চাইলেই ধ্বংস করতে পারবে না। যে বা যারা এই প্রাচীন সভ্যতাকে ধ্বংস করার অপচেষ্টা করছে, তারা আসলে পরোক্ষভাবে নিজেদের দেশেরই মারাত্মক ক্ষতি করছে।’ মাজিয়ার এই মন্তব্যকে বিশ্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দেওয়া এক চরম হুমকির সরাসরি জবাব হিসেবে দেখছেন।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-আমেরিকা ও ইসরায়েলের মধ্যকার ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে চরম সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, তবে মার্কিন সামরিক হামলায় ইরানের ‘পুরো সভ্যতা ধূলিসাৎ বা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে’।
তবে প্রবাসী ইরানি নারী মাজিয়ার মতে, ট্রাম্পের সেই যুদ্ধের হুমকির প্রভাব ইরানে সম্পূর্ণ উল্টো হয়েছে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধ ইরানকে ধ্বংস তো করেইনি, উল্টো আমাদের দেশকে আরও বেশি শক্তিশালী করেছে। এটি দেশের ভেতর নানা মতের মানুষকে এক কাতারে এনে ঐক্যবদ্ধ করেছে।’ মাজিয়া আরও দাবি করেন, মার্কিন ও ইসরায়েলি বিদেশি চাপ ইরানিদের জাতীয় ঐক্য ও সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছে।
সাক্ষাৎকারে তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর আধিপত্যবাদী ও হস্তক্ষেপমূলক নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর ভাষায়, ‘যারা অন্য স্বাধীন দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ জোরপূর্বক কেড়ে নিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের বিশ্বমঞ্চে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে।’ এ সময় তিনি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার উদাহরণ টেনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে অবৈধভাবে সামরিক শক্তি ব্যবহারের অভিযোগ তোলেন। গ্র্যান্ড মোসাল্লায় প্রবেশের আগে তিনি পশ্চিমাদের তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’ দেওয়ার ধারণাকেও সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সিরিয়া, ইরাক বা আফগানিস্তানে মার্কিনিরা যে ধরনের ধ্বংসাত্মক গণতন্ত্র উপহার দিয়েছে, তা নিয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র কোনো আগ্রহ নেই।’
মাজিয়া আরও বলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধে মিনাবের একটি মেয়েদের স্কুলে কথিত মার্কিন বিমান হামলায় নিহত হওয়া নিষ্পাপ শিশুদের ট্র্যাজেডির স্মৃতি এখনও ইরানিদের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আমরা এই বর্বরোচিত শোকাবহ ঘটনা ভুলে যাইনি; একদিনের জন্যও না।’ একই সাথে তিনি সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের উদ্দেশে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রক্তক্ষয়ী সংঘাতে তাদের ও ওয়াশিংটন সরকারের আগ্রাসী ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আহ্বান জানান। তাঁর দাবি, নিরীহ শিশুদের প্রাণ কেড়ে নেওয়া এসব যুদ্ধ মূলত সাধারণ মার্কিন করদাতাদের অর্থ দিয়েই হোয়াইট হাউস পরিচালনা করছে।
এদিকে, ইরানের জাতীয় পতাকা ও কালো ব্যানার হাতে শোকাহত মানুষের এক বিশাল ও অভূতপূর্ব ঢল তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লার দিকে এখনও অব্যাহত রয়েছে, যেখানে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির মরদেহ শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাখা হয়েছে। প্রয়াত নেতার শাহাদাত স্মরণে শিয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী শোকগীতি ‘নোহার’ সুর আজ পুরো রাজধানীজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। লাখ লাখ মানুষ তীব্র রোদ ও গরম ধৈর্য ধরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তাঁদের প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।
তেহরানের প্রধান সড়কগুলো জাতীয় পতাকা, কালো শোকের ব্যানার ও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতীকে সজ্জিত করা হয়েছে। শহরের প্রায় প্রতিটি মোড়ে অবস্থান নেওয়া হাজারো স্বেচ্ছাসেবকেরা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকা বিশাল জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষকে পথনির্দেশনা দেওয়ার কাজে দিনরাত কাজ করছেন। আয়োজক কমিটির ধারণা, আজ তেহরানের এই প্রধান শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে (কয়েক লাখ) পৌঁছাতে পারে।
প্রসঙ্গত, ১৯৮৯ সাল থেকে দীর্ঘ চার দশক ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে লৌহকঠিন দায়িত্বে পালন করা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের এক যৌথ ও আকস্মিক বিমান হামলায় নিহত হন বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে তেহরানজুড়ে এক অভূতপূর্ব শোকের আবহ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এরই মধ্যে আরেকটি রাজনৈতিক ও আবেগঘন দৃশ্যও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ও দেওয়ালে মিনাবের সেই মেয়েদের স্কুলে কথিত মার্কিন হামলায় নিহত ১৫০ জনেরও বেশি স্কুলছাত্রীর ছবি সংবলিত বড় বড় পোস্টার টাঙানো হয়েছে। শোকবার্তার পাশে রাখা নিষ্পাপ শিশুদের এসব ছবি আগত মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে সাম্প্রতিক যুদ্ধের ভয়াবহতা ও ক্ষতের কথা।
ইরান যখন তাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতার দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে, তখনও যুদ্ধের সেই দগদগে ক্ষত দেশটির মানুষের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। তেহরান থেকে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির এই শেষকৃত্যের শোভাযাত্রা আজ সোমবার ঐতিহাসিক কুম শহরে যাবে। এরপর মরদেহ ধর্মীয় নিয়ম মেনে নেওয়া হবে ইরাকের পবিত্র শিয়া শহর নাজাফ ও কারবালায়। সবশেষে আগামী ৯ জুলাই উত্তর-পূর্ব ইরানের ঐতিহ্যবাহী মাশহাদ শহরে ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাহিত করা হবে।
বর্তমানে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সারাদিন ধরে খামেনির জানাজা ও বিশেষ শোকানুষ্ঠান চলছে। সেখানে সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে যখন খামেনির কনিষ্ঠ নাতি-নাতনির একটি ছবি তাঁর কফিনের পাশে এনে রাখা হয়। ছবিটি দেখে জানাজায় আসা অনেক শক্ত হৃদয়ের মানুষও কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে বর্তমান যুদ্ধকালীন কঠিন পরিস্থিতিতে খামেনির এই রাজকীয় বিদায়কে কেন্দ্র করে দেশটির বর্তমান ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব অন্তত সাময়িকভাবে হলেও দেশের জনগণের একটি বড় অংশকে নিজেদের পক্ষে ও ঐক্যবদ্ধ রাখতে পুরোপুরি সক্ষম হয়েছে বলেই মনে করছেন মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষকেরা।
|