শিল্প খাতে স্থবিরতা ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির কারণ এবং করণীয়

প্রকাশ: সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ০২:০৬ অপরাহ্ণ
শিল্প খাতে স্থবিরতা ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির কারণ এবং করণীয়

অনলাইন ডেস্ক: সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যেখানে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, সেখানে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তথা শিল্প খাতের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়ে নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে—যা গত দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সাথে গত দুই বছরে দেশে পাঁচ শতাধিক মাঝারি ও বড় শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে (আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবালের মতে এই সংখ্যা প্রায় এক হাজার)। শুধু তৈরি পোশাক খাতেই কাজ হারিয়েছেন ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাকের রপ্তানি আদেশ (অর্ডার) বাতিল বা অন্য দেশে চলে গেছে। একটি বিকাশমান অর্থনীতিতে যেখানে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে উঁচুতে থাকার কথা, সেখানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য চরম উদ্বেগজনক।

সম্প্রতি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ‘সমকাল’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে বিশিষ্ট গবেষক ও বিশ্লেষক আবু তাহের খান এক নিবন্ধে দেখিয়েছেন, এই পতন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। গত প্রায় দুই বছর ধরে দেশে বিরাজমান তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার পাশাপাশি রাষ্ট্রের তিনটি মৌলিক ও দীর্ঘমেয়াদি ত্রিমাত্রিক গাফিলতির কারণেই শিল্প খাত আজ সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে।

সংকটের নেপথ্যে মূল ত্রিমাত্রিক কারণ:

১. সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উগ্রপন্থা: বিগত দুই বছর ধরে দেশের অভ্যন্তরে যে ধরনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং মাঠপর্যায়ে মব (উচ্ছৃঙ্খল জনতা) ও উগ্রপন্থা প্রভাবিত কর্মকাণ্ড চলেছে, তা শিল্পকারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করেছে। কলকারখানায় ভাঙচুর, জোরপূর্বক কাজ বন্ধ রাখা এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে বিদেশি ক্রেতারা এ দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে রপ্তানি আদেশে।

২. নীতি পর্যায়ে সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গির অভাব: বাংলাদেশ সৃষ্টির পর ১৯৯১ সাল পর্যন্ত শিল্প বলতে কেবল ‘উৎপাদন’ (ম্যানুফ্যাকচারিং) খাতকেই বোঝানো হতো। কিন্তু ১৯৯১ সালে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পরামর্শে তৎকালীন সরকার শিল্পনীতিতে ‘সেবা খাত’কেও শিল্পের অন্তর্ভুক্ত করে উভয় খাতের জন্য সমসুবিধার বিধান চালু করে। গত সাড়ে তিন দশকে একাধিক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলেও কোনো সরকারই এই নীতি পরিবর্তন করেনি। ফলে উৎপাদন খাতের চেয়ে সেবা ও ট্রেডিং (ব্যবসা) তুলনামূলক সহজ হওয়ায় দেশের উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি ভারী শিল্প স্থাপনের চেয়ে সহজে মুনাফা লাভের ব্যবসায় ঝুঁকেছেন। ফলে উৎপাদন খাত দিনে দিনে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এবং দেশ উৎপাদক রাষ্ট্র হওয়ার গৌরব হারিয়ে বিদেশি পণ্যের বিশাল বাজারে পরিণত হচ্ছে।

৩. সেবাদানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অবকাঠামোগত অদক্ষতা: বর্তমানে দেশের শিল্প খাতের নীতি সহায়তা ও তদারকি কার্যক্রম একক কোনো দপ্তরের অধীনে নেই; বরং তা শিল্প মন্ত্রণালয়, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ নানা বিচিত্র সংস্থা ও অধিদপ্তরের অধীনে খণ্ড খণ্ড (পিচমিল) ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকও একসময় এই খাতে খামখেয়ালিভাবে ঋণ বিতরণ করেছে। এই ‘হযবরল’ অবস্থার কারণে উদ্যোক্তাদের একটি ছোট লাইসেন্স বা পরিষেবার জন্য রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তরে চর্কির মতো ঘুরে মরতে হচ্ছে। তার ওপর যুক্ত হয়েছে শিল্প সচল রাখার প্রধান ভৌত উপকরণ—প্লট, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির তীব্র সংকট। এই অবকাঠামোগত সহায়তা সময়মতো ও নিরবচ্ছিন্নভাবে না পাওয়ার কারণেই সিংহভাগ কারখানা বন্ধ হয়েছে। শিল্প মালিকদের দাবি, এমনকি অনৈতিক লেনদেনের (ঘুষ) বিনিময়েও যদি রাষ্ট্র এই সেবাগুলো অন্তত দক্ষতার সাথে দ্রুত সরবরাহ করত, তবে নিরুপায় হয়ে উৎপাদন সচল রাখতে তাঁরা তাও মেনে নিতেন। কিন্তু সেখানেও আমলাতান্ত্রিক চরম ধীরগতি ও অমার্জনীয় অদক্ষতা বিরাজমান।

সংকট উত্তরণে জরুরি ৬ দফা প্রস্তাবনা:

এই গভীর অর্থনৈতিক মন্দা এবং শিল্প খাতের ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভেঙে সরকারকে অবিলম্বে ৬টি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা:

  • প্রথমত: মব, উগ্রপন্থা ও উসকানিমূলক সব ধরনের কার্যক্রমকে যেকোনো রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে উঠে কঠোর হস্তে দমন ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে কারখানাগুলোতে নিরাপদ কাজের পরিবেশ ফেরে।

  • দ্বিতীয়ত: অবিলম্বে বর্তমান যুগের সাথে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় শিল্পনীতি সংশোধন করতে হবে এবং সাধারণ ব্যবসা বা সেবা খাতের চেয়ে প্রকৃত ‘উৎপাদনমুখী শিল্প’ খাতের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও অগ্রাধিকারমূলক বিশেষ সুবিধার বিধান যুক্ত করতে হবে।

  • তৃতীয়ত: শিল্পকারখানার চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মতো অতি জরুরি অবকাঠামোগত সহায়তাসমূহ কোনো প্রকার দুর্নীতি ও কালক্ষেপণ ছাড়া সর্বোচ্চ গতি ও দক্ষতার সাথে নিশ্চিত করতে হবে।

  • চতুর্থত: দেশের সকল নৌ, স্থল ও বিমানবন্দরকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত এবং দুর্নীতিমুক্ত করে শিল্পের কাঁচামাল দ্রুত আমদানি ও উৎপাদিত পণ্য নির্বিঘ্নে রপ্তানির জন্য সম্পূর্ণ ‘উদ্যোক্তাবান্ধব’ হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে।

  • পঞ্চম Barb: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য রাষ্ট্রের আর্থিক ও পুঁজি সহায়তা (ঋণ প্রদান) কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ, সহজ ও ত্বরিত গতিসম্পন্ন করতে হবে।

  • ষষ্ঠত: রাষ্ট্রের সামগ্রিক দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিল্প খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারমূলক ‘শীর্ষ খাত’ হিসেবে বিবেচনা করে বাজেটে আনুষঙ্গিক বরাদ্দ ও আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

দেশের আমলাতন্ত্র-নির্ভর ও স্থবির রাষ্ট্রব্যবস্থায় এসব প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারকদের কাছে কতটা গুরুত্ব পাবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ও সংশয় রয়েছে। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী ও রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের এটি মনে রাখা দরকার যে, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড এই মুহূর্তে মোটেও ভালো অবস্থায় নেই। তৈরি পোশাক ও ভারী শিল্প খাতের এই ত্রিমাত্রিক রোগগুলোর প্রতি যদি এখনই জরুরি ভিত্তিতে মনোযোগ দেওয়া না হয়, তবে নিকট ভবিষ্যতে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এতটাই নাজুক ও দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে, যে দায়ভার নেওয়া একটি দায়িত্বশীল সরকারের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।

মন্তব্য করুন