লেবাননে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইরানের ভূমিকা অপরিহার্য
অনলাইন ডেস্ক: আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষাকারী প্রধান শক্তি হিসেবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সক্রিয় ভূমিকা ও হস্তক্ষেপ ছাড়া লেবাননের মাটিতে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ। স্থানীয় সময় গতকাল রবিবার (৫ জুলাই) তেহরানে লেবাননের প্রতিরোধ যোদ্ধা ও সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর অত্যন্ত জ্যেষ্ঠ ও কেন্দ্রীয় সদস্য মুহাম্মদ ফনিশের সঙ্গে এক বিশেষ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তিনি এই মন্তব্য করেন।
স্পিকার কালিবাফ বলেন, ‘বিগত সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক বর্বরোচিত ও একপাক্ষিক আগ্রাসনের ফলেই মূলত লেবাননসহ সমগ্র বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়া (মধ্যপ্রাচ্য) অঞ্চলে তীব্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছিল। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এই অশান্ত অঞ্চলে শান্তি ও স্বস্তি কেবল ইরানের কূটনৈতিক ও সামরিক মধ্যস্থতার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব।’
এই জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বৈঠকে আরও প্রকাশ করেন যে, গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ওমানের আদলে যে বিশেষ ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেখানে হিজবুল্লাহসহ এই অঞ্চলে ইরানের মিত্র ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ বা প্রতিরোধ শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে সব ধরনের পশ্চিমা ও ইসরায়েলি আগ্রাসন অবিলম্বে বন্ধ করার বিষয়ে চুক্তিতে অত্যন্ত স্পষ্ট ও কড়া শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে তেহরানের পক্ষ থেকে লেবাননের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক চলাকালীন স্পিকার কালিবাফ সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার পর তেহরানের সমর্থনে ও পাশে দাঁড়িয়ে ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর বীরত্বপূর্ণ ও সাহসী ফ্রন্টলাইন লড়াইয়ের তীব্র প্রশংসা করেন। তিনি এই প্রতিরোধ যুদ্ধকে ‘ইতিহাসের একটি বড় সন্ধিক্ষণ’ হিসেবে অভিহিত করে উল্লেখ করেন যে, এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম প্রমাণ করে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো এবং ইরানের মধ্যকার আত্মিক ও বৈপ্লবিক বন্ধন কতটা অটুট ও অবিচ্ছেদ্য।
উল্লেখ্য, কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বন্ধুরাষ্ট্র পাকিস্তানের বিশেষ মধ্যস্থতায় ১৪ দফার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করে। ওই শান্তি ফর্মুলায় লেবানন সীমান্তসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব চলমান রণাঙ্গনে শত্রুতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের ওপর থেকে পশ্চিমাদের দেওয়া আন্তর্জাতিক নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুনর্বহালের জোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকের সুনির্দিষ্ট শর্তের আওতাতেই বর্তমানে উভয় পক্ষ (তেহরান ও ওয়াশিংটন) একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ৬০ দিনের একটি জটিল ও দীর্ঘ আলোচনা প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে। লেবানন সরকারের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চ মাসের শুরুর দিকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) লেবাননের অভ্যন্তরে সর্বশেষ দফা ভয়াবহ বিমান ও স্থল হামলা শুরু করার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশটির অন্তত ৪ হাজার ৩০০ জন নিরীহ নাগরিক নিহত এবং ১২ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন।
ইরানি কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক মহলকে আশ্বস্ত করে বলছেন, তেহরান এই মুহূর্তে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে লেবানন যুদ্ধের স্থায়ী অবসান এবং দেশটির সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যা ওয়াশিংটনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের অন্যতম প্রধান ও অলঙ্ঘনীয় বিষয়।
গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে হিজবুল্লাহর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য মুহাম্মদ ফনিশ ইরানি স্পিকারের বক্তব্যের সাথে পূর্ণ একাত্মতা পোষণ করে বলেন, ‘হিজবুল্লাহর প্রতিটি যোদ্ধা নিজেদের ইরানের ঐতিহাসিক ইসলামি বিপ্লবের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে।’ তিনি লেবাননের এই শক্তিশালী প্রতিরোধ গোষ্ঠী এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যকার সম্পর্ককে সর্বদা ভ্রাতৃত্বপূর্ণ এবং তা গভীর ধর্মীয় ও বৈপ্লবিক আদর্শিক বন্ধনের ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে পুনর্ব্যক্ত করেন।
মুহাম্মদ ফনিশ আরও যোগ করে বলেন, মূলত ইরানের সরাসরি কূটনৈতিক ও সামরিক হস্তক্ষেপই ইসরায়েলকে লেবাননের ওপর সাম্প্রতিক যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করেছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, তেহরানের বলিষ্ঠ হস্তক্ষেপের কারণেই শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমঝোতা স্মারকের কড়া শর্তাবলী মেনে চলতে বাধ্য হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়েই লেবাননের ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধ থামানো সম্ভব হয়েছিল। এখন এই একই পথ ও আলোচনার মাধ্যমেই চলমান এই সংকটের একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী সমাপ্তি অর্জন করা যেতে পারে।’
|