দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ৫৩ হাজার অবৈধ বিদেশি নাগরিককে বহিষ্কার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দক্ষিণ আফ্রিকায় সাম্প্রতিক সময়ে ছড়িয়ে পড়া তীব্র অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ ও সহিংসতার পর নথিপত্রহীন (অবৈধ) অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় ও কঠোর ক্র্যাকডাউন শুরু করেছে দেশটির সরকার। পাঁচ সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া বিশেষ ‘অভিবাসন ব্যবস্থাপনা’ অভিযানের আওতায় এখন পর্যন্ত ৫৩ হাজারের বেশি বিদেশি নাগরিককে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো বা নির্বাসিত করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারি সূত্র ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন থেকে এই গণ-নির্বাসনের তথ্য জানা গেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় উচ্চ বেকারত্ব, ক্রমবর্ধমান অপরাধের হার এবং বিদ্যুৎ-পানিসহ বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা ভেঙে পড়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই নথিপত্রহীন অভিবাসীদের দায়ী করে আসছে দেশটির সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং গণ নির্বাসনের দাবিতে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়, যা একপর্যায়ে সহিংসতা, ভীতি প্রদর্শন এবং বিদেশিদের দোকানপাটে লুটপাটের রূপ নেয়। আন্দোলনকারীরা নথিপত্রহীন অভিবাসীদের দেশ ছাড়ার জন্য গত ৩০ জুন একটি অনানুষ্ঠানিক সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল। এরপর থেকেই জানমালের সুরক্ষায় অনেক বিদেশি নিজ ইচ্ছায় দেশ ছাড়তে শুরু করেন। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঘানা, নাইজেরিয়া, উগান্ডা ও কেনিয়াসহ কয়েকটি দেশ বিমান পাঠিয়ে তাদের নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে নেয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিচার ও সাংবিধানিক উন্নয়নমন্ত্রী মামোলোকো কুবাইয়ি প্রিটোরিয়ায় এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জানান, বিশেষ এই অভিযানে এখন পর্যন্ত মোট ৫৩ হাজার ৪৯৯ জন বিদেশি নাগরিককে আইনি প্রক্রিয়ায় নির্বাসন বা নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের বেশিরভাগই প্রতিবেশী রাষ্ট্র মালাউই, জিম্বাবুয়ে ও মোজাম্বিকের নাগরিক। অভিযান চলমান থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। মন্ত্রী আরও জানান, তল্লাশি অভিযান পরিচালনার সময় এমন বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে, যারা বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের দায়ে পুলিশের তালিকাভুক্ত ওয়ান্টেড আসামি ছিলেন।
তবে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার স্পষ্ট করেছে যে, তারা এমন একটি সুশৃঙ্খল অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় যা জনগণের উদ্বেগকে যেমন প্রাধান্য দেবে, ঠিক তেমনি অভিবাসীদের মানবাধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করবে। একই সাথে বিক্ষোভকারীরা যেন কোনো প্রবাসী বা সন্দেহভাজনদের বাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আইনবহির্ভূতভাবে অননুমোদিত তল্লাশি না চালায়, সে বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার এই গণ-অভিবাসন অভিযানের মুখে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে দেশটির আর্থ-সামাজিক সমস্যার জন্য অভিবাসীদের এককভাবে দায়ী না করার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, রাজনৈতিক বা সামাজিক সংকটে অভিবাসীদের ‘বলির পাঁঠা’ বানালে পরিস্থিতি আরও জটিল ও রক্তক্ষয়ী হয়ে উঠতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা প্রবাসীদের ওপর স্থানীয় নাগরিকদের অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি জনগণের উদ্বেগকে যৌক্তিক আখ্যা দিয়েও সবাইকে সতর্ক করে বলেছেন, কেউ যেন কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়। উল্লেখ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম শীর্ষ ধনী ও উন্নত রাষ্ট্র হওয়ায় উন্নত জীবন ও অর্থনৈতিক ভাগ্যের সন্ধানে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ বৈধ ও অবৈধ উপায়ে এ দেশে পাড়ি জমায়, যা এখন দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
|