বিভিন্ন ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক, মেয়েকে হত্যা করে বস্তাবন্দী লাশ সড়কে ফেলে দেন বাবা-মা

প্রকাশ: শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ০২:২৮ অপরাহ্ণ
বিভিন্ন ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক, মেয়েকে হত্যা করে বস্তাবন্দী লাশ সড়কে ফেলে দেন বাবা-মা
আরফানা হোসেন নির্জনা

খুলনা মহানগরীর প্রান্তিকা আবাসিক এলাকা থেকে প্লাস্টিকের বস্তাবন্দী অবস্থায় এক কিশোরীর অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের লোমহর্ষক ঘটনার রহস্য মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে উন্মোচন করেছে পুলিশ। নিজের ১৬ বছরের আপন মেয়েকে পিটিয়ে হত্যার অপরাধে নিহতের মা আরিফা ইয়াসমিন সিমাকে (৩৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ইতিমধ্যে আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি নিজের মেয়েকে নির্মমভাবে হত্যার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডে নিহতের বাবা মো. আলিম হোসেন আকাশের প্রত্যক্ষ ইন্ধন বা সহযোগিতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি ওনাকে গ্রেপ্তারে জোর অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।

আজ শনিবার (১১ জুলাই) খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) সদর দপ্তরে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান।

 পুলিশ কমিশনার জানান, গত ৮ জুলাই গভীর রাতে খুলনা নগরীর সোনাডাঙ্গা থানাধীন প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কের পাশে একটি পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বস্তার ভেতর থেকে অজ্ঞাত পরিচয় এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সুরতহাল শেষে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয় এবং ঘটনার রহস্যভেদে সদর থানা পুলিশ মাঠে নামে।

তদন্তের প্রাথমিক অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল ও আশেপাশের এলাকার সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। এরপর আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সুক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে লাশটির পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয় পুলিশ। নিহত কিশোরীর নাম আরফানা হোসেন নির্জনা (১৬)। এই ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গত শুক্রবার (১০ জুলাই) খুলনা সদর থানায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পরিচয় শনাক্তের পর নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সিমাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে শুরুতে তিনি চরম বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। তবে সিসিটিভি ফুটেজ ও অকাট্য প্রমাণের মুখে একপর্যায়ে তিনি ভেঙে পড়েন এবং বিজ্ঞ আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যার সম্পূর্ণ দায় স্বীকার করেন।

ঘাতক মায়ের দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, নিহত কিশোরী নির্জনার সাথে একাধিক ছেলের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এই বিষয়টি নিয়ে পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র ক্ষোভ ও অশান্তি বিরাজ করছিল। গত ৮ জুলাই রাতে এই প্রেমঘটিত বিষয় নিয়ে নির্জনার সাথে ওনার মায়ের তীব্র বাকবিতণ্ডা ও ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে রাগ ও ক্ষোভের মাথায় মা সিমা ঘরে থাকা একটি শক্ত কাঠের লাঠি দিয়ে নির্জনার মাথায় ও শরীরে এলোপাতাড়ি পেটাতে শুরু করেন। লাঠির গুরুতর আঘাতে ঘটনাস্থলেই নির্জনার মৃত্যু হয়।

পরবর্তীতে নিজের অপরাধ ধামাচাপা দিতে এবং ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে স্বামী-স্ত্রী মিলে নির্জনার মরদেহ একটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে গভীর রাতে প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার অন্ধকার রাস্তায় ফেলে রেখে আসেন।

কেএমপি কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, “ঘটনাটি জানার পর আমাদের টিম অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। ওনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তাক্ত কাঠের লাঠিটি আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। এই অনার কিলিং বা পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের বাবা মো. আলিম হোসেন আকাশ সমানভাবে অভিযুক্ত। ওনাকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং দ্রুতই ওনাকে আইনের আওতায় আনা হবে।”

মন্তব্য করুন