আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল: মেসির ২১ বছরের অপেক্ষা
স্পোর্টস ডেস্ক: লিওনেল মেসির ফুটবল ক্যারিয়ারের অর্জনের খাতাটি এতটাই সমৃদ্ধ ও মহাকাব্যিক যে, সেখানে নতুন করে কোনো আক্ষেপের গল্প খোঁজা বোকামি। ক্যারিয়ারের প্রাপ্তির বৃত্ত তিনি বহু আগেই সম্পূর্ণ করেছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলের পাতায় একটি অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান এতদিন অপূর্ণই থেকে গিয়েছিল— তা হলো ফুটবলের জনক বা ‘থ্রি লায়ন্স’ খ্যাত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির কোনো ম্যাচ না খেলা।
ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি কিংবা স্পেনের মতো বিশ্ব ফুটবলের সব পরাশক্তির বিপক্ষে একাধিকবার মাঠে নামলেও, গত দুই দশক ধরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির বুট জোড়া কখনো মাঠের ঘাস ছোঁয়নি। অবশেষে আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুই দশকেরও বেশি সময়ের সেই ঐতিহাসিক আক্ষেপ ও অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মঞ্চে।
মেসির এই ইংল্যান্ড-বঞ্চনার গল্পটা শুরু হয়েছিল আজ থেকে ২১ বছর আগে, তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একদম প্রথম দিনেই। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে তৎকালীন ১৮ বছর বয়সী বিস্ময় বালক মেসির আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেক ঘটে। তৎকালীন কোচ হোসে পেকারমান ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে মেসিকে মাঠে নামান। কিন্তু স্বপ্নের সেই দিনটি নরক হতে সময় নিয়েছিল মাত্র ৪৭ সেকেন্ড।
মাঠে নামার পরপরই হাঙ্গেরির এক ডিফেন্ডার মেসির জার্সি টেনে ধরেন। মেসি নিজেকে মুক্ত করতে হাত সরানোর চেষ্টা করলে রেফারি ভুলবশত সেটিকে ‘কনুই দিয়ে ইচ্ছাকৃত আঘাত’ হিসেবে গণ্য করেন এবং মেসিকে সরাসরি লাল কার্ড (Red Card) দেখিয়ে মাঠছাড়া করেন। ঘটনার দুই দশক পর হাঙ্গেরির সেই ডিফেন্ডারও স্বীকার করেছিলেন যে, ভুলটি তাঁর ছিল এবং মেসির উদ্দেশ্য আঘাত করা ছিল না।
সেই লাল কার্ডের কারণে মেসিকে এক ম্যাচের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা পোহাতে হয়। আর ভাগ্যের চরম নির্মম পরিহাসে, সেই নিষেধাজ্ঞাটি কার্যকর হয়েছিল ২০০৫ সালের নভেম্বর মাসেই— ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার বহুল আলোচিত এক প্রীতি ম্যাচে! ফলে সেবার ডাগআউটে বা বেঞ্চে বসেই মেসিকে দেখতে হয়েছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-২ গোলের ঐতিহাসিক পরাজয়।
এরপর গত দুই দশকে নানা টুর্নামেন্টের ভিন্ন সূচি, মহাদেশীয় দূরত্ব এবং আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার হার নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ার কারণে আর কখনোই হ্যারি কেন বা জর্ডান পিকফোর্ডদের মুখোমুখি হতে পারেননি মেসি।
এই দীর্ঘ সময়ে মেসি দেশের হয়ে ১২৫টিরও বেশি গোল করেছেন, আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের ট্রফি খরা কাটিয়ে কোপা আমেরিকা এনে দিয়েছেন এবং পরবর্তীতে কাতার বিশ্বকাপে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজেকে অমরত্ব দিয়েছেন।
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করার পর ইংল্যান্ড ম্যাচ নিয়ে নিজের গভীর অনুভূতির কথা প্রকাশ করে ৩৯ বছর বয়সী মেসি বলেন, “ব্যক্তিগতভাবে এটাই হবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আমার খেলা প্রথম কোনো ম্যাচ। আমি ক্যারিয়ারে প্রায় সব বড় দেশের বিপক্ষেই খেলেছি, শুধু ইংল্যান্ড বাকি ছিল। তাই এই ম্যাচটি আমার কাছে ভীষণ আলাদা গুরুত্ব বহন করে।”
মেসি আরও যোগ করেন, “১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ কিংবা দিয়েগো মারাদোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ ও শতাব্দীর সেরা গোলের স্মৃতি আমি কেবল ভিডিওতেই দেখেছি। তবে বর্তমান আমাদের এই আর্জেন্টিনা দল কোনো প্রতিপক্ষকেই ভয় পায় না। ইংল্যান্ড বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ দল, আর এমন দলের বিপক্ষে সেমিফাইনালের মতো বড় মঞ্চে খেলাটা সবসময়ই বিশেষ কিছু।”
আগামীকাল ডালাসের মাঠের লড়াইয়ে যখন রেফারি বাঁশি বাজাবেন, তখন ৪৭ সেকেন্ডের সেই পুরনো অভিষেকের দুঃস্বপ্ন পুরোপুরি ভুলে ২১ বছর পর এক নতুন ইতিহাস লিখতে মাঠে নামবেন লিওনেল মেসি।
|