শ্রীলঙ্কার কারাগারে ভয়াবহ দাঙ্গায় ২৬ জন নিহত, দায় নিলেন আইনমন্ত্রী

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০১:৫১ অপরাহ্ণ
শ্রীলঙ্কার কারাগারে ভয়াবহ দাঙ্গায় ২৬ জন নিহত, দায় নিলেন আইনমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শ্রীলঙ্কার একটি রাষ্ট্রীয় কারাগারে বন্দিদের দুটি মাদক চোরাকারবারি পক্ষের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে সৃষ্ট এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায় ২৬ জন নিহত হয়েছেন। দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ও নৃশংস এই কারা সহিংসতার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন দেশটির বর্তমান আইনমন্ত্রী হর্ষণা নানায়াক্কারা। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ঘটনার পেছনে প্রশাসনিক কোনো গাফিলতি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কলম্বোর স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানী কলম্বোর উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত উপকূলীয় শহর নেগোম্বোর একটি কেন্দ্রীয় কারাগারে এই রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। গত রবিবার (৫ জুলাই) কারাগারের ভেতরে থাকা কুখ্যাত দুটি মাদক ব্যবসায়ী চক্রের মধ্যে অভ্যন্তরীণ তথ্য ফাঁসকে কেন্দ্র করে প্রথম বিরোধের সূত্রপাত হয়। যা পরবর্তীতে গত সোমবার (৬ জুলাই) সকালে বন্দিদের সকালের খাবার দেওয়ার সময় এক অনিয়ন্ত্রিত ও হিংস্র দাঙ্গায় রূপ নেয়। দুই দিন ধরে চলা এই নজিরবিহীন সহিংসতায় কারারক্ষী, সাধারণ বন্দি ও পুলিশ সদস্যসহ ১০০ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন।

কারা সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সংঘর্ষ চলাকালীন কয়েক শ বন্দি কারাগারের প্রধান ফটক ভেঙে বিভিন্ন প্রশাসনিক অংশ ও কারা হাসপাতালে প্রবেশ করে জীবনরক্ষাকারী বিভিন্ন ওষুধ ও ড্রাগ লুট করে। এ সময় তারা হাসপাতালের লোহার বেড ও বিভিন্ন ধাতব জিনিসপত্র ভেঙে ধারালো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বেশ কিছু বন্দি এই সুযোগে প্রাচীর টপকে কারাগার থেকে পালানোর চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কারারক্ষীরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে বাধ্য হন।

সহিংসতায় গুলিবিদ্ধ, ধারালো অস্ত্রের কোপ এবং মাথায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত রক্তাক্ত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় নেগোম্বো হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় প্রায় ২০ জনকে দ্রুত কলম্বোর জাতীয় হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের জরুরি অস্ত্রোপচার (সার্জারি) করা হয়েছে।

নেগোম্বো কারাগারের গণমাধ্যম মুখপাত্র এ সি গজনায়াকে জানান, সরকারি হিসাব অনুযায়ী এই ভয়াবহ দাঙ্গায় এখন পর্যন্ত মোট ২৬ জন নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে ৭ জন কর্তব্যরত কারারক্ষী এবং ১৯ জন কারাবন্দি রয়েছেন। এই ঘটনার পর নেগোম্বো কারাগারের বাইরে নিখোঁজ ও অবরুদ্ধ স্বজনদের খোঁজে শত শত পরিবারের সদস্যরা ভিড় জমিয়েছেন। অনেকেই নিজের সন্তানের বা স্বামীর বেঁচে থাকার খবর জানতে চেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং প্রশাসনের কাছে জবাবদিহিতা দাবি করেন। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং নতুন করে সহিংসতা এড়াতে পুলিশ, বিশেষ টাস্ক ফোর্স (STF), দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ ইউনিটসহ সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের বুট ও ড্রোন দিয়ে পুরো কারা এলাকা সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।

ভয়াবহ এই ট্র্যাজেডির পর এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে লঙ্কান আইনমন্ত্রী হর্ষণা নানায়াক্কারা বলেন, ‘বর্তমানে পরিস্থিতি পুরোপুরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে কারাগারের ভেতরে কোনো ধরনের প্রাণহানি বা মানবাধিকার লঙ্ঘন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা এই ঘটনায় গভীরভাবে হতবাক ও মর্মাহত। এই দুঃখজনক ঘটনা আমাদের কর্মী ও বন্দি—উভয় পক্ষকেই বড় ধরনের মানসিক ধাক্কা দিয়েছে।’

নিজের নৈতিক দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘যেহেতু আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনেই পুরো কারা ব্যবস্থা পরিচালিত হয়, তাই আইনমন্ত্রী হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার দায় আমাকে স্বীকার করতেই হবে। আমরা কারও ভুল ঢাকতে বা কোনো অপরাধী কর্মকর্তাকে রক্ষা করতে চাই না। তদন্তে যার গাফিলতি প্রমাণিত হবে, তার বিরুদ্ধেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

উল্লেখ্য, নেগোম্বো কারাগারের এই লোমহর্ষক দাঙ্গা শ্রীলঙ্কার দীর্ঘদিনের ভঙ্গুর ও জরাজীর্ণ কারা সংকটকে আবারও বিশ্বমঞ্চে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে। দেশটির কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত বন্দি রাখা, ভেতরের মাদক সিন্ডিকেটের অবাধ প্রভাব এবং পর্যাপ্ত কারারক্ষীর অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। পরিসংখ্যান বলছে, পুরো শ্রীলঙ্কায় যেখানে মাত্র ১০ হাজার বন্দি রাখার মতো অবকাঠামো রয়েছে, সেখানে বর্তমানে ৩৯ হাজারের বেশি বন্দিকে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। এর আগে ২০২০ সালের ডিসেম্বরেও দেশটির মাহারা কারাগারে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি ও কোভিড পরিস্থিতি নিয়ে সৃষ্ট এক দাঙ্গায় ১১ জন বন্দি নিহত হয়েছিলেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মাথায় এমন বড় আকারের সহিংসতা বর্তমান প্রশাসনের জন্য একটি বড় পরীক্ষা বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।

মন্তব্য করুন