আধুনিক ফুটবলের সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছেন আর্লিং হালান্ড
স্পোর্টস ডেস্ক: ফুটবল বিশ্ব আজ পর্যন্ত অসংখ্য কালজয়ী কিংবদন্তির উত্থান দেখেছে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, ওয়েইন রুনি, রোনালদো নাজারিও, দিয়েগো ম্যারাডোনা কিংবা কালো মানিক পেলে—প্রত্যেকেই ফুটবল মাঠে নিজস্ব ঘরানায় রাজত্ব করেছেন। কেউ নিখুঁত ড্রিবলিং বা বল নিয়ন্ত্রণে, কেউ অবিশ্বাস্য গতিতে, আবার কেউ বুলেটের মতো ফিনিশিং বা দানবীয় শারীরিক সামর্থ্যে ছিলেন অনন্য। তবে নিখুঁত চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফুটবলীয় ব্যাকরণে এই কিংবদন্তিদের প্রত্যেকের খেলাতেই কিছু না কিছু ছোটখাটো সীমাবদ্ধতা ছিল।
কিন্তু নরওয়ের ২৪ বছর বয়সী স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড যেন ফুটবল ইতিহাসের সেই চেনা ও প্রচলিত ধারণাকেই সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছেন। উত্তর আমেরিকার মাটিতে চলমান ২০২৬ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন শক্তিশালী ব্রাজিলকে একাই জোড়া গোল করে বিদায় করার পর এখন বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মনে একটাই প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে—হালান্ড কি সত্যিই একজন সাধারণ মানুষ, নাকি আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণাগারে তৈরি কোনো ‘বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারড’ রোবটিক অ্যাথলেট?
৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার এই নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকারের মাঠে চিতার মতো বিস্ফোরক গতি, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের উড়িয়ে দেওয়ার মতো শক্তিশালী শারীরিক গঠন এবং গোল করার অবিশ্বাস্য যান্ত্রিক বা রোবটিক দক্ষতা তাঁকে এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ফরোয়ার্ডে পরিণত করেছে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ফুটবল বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি কেবল জন্মগত কোনো প্রতিভা বা ঈশ্বরপ্রদত্ত শারীরিক গঠন নয়; বরং নিজের শরীর, মন এবং দৈনিক জীবনযাপনকে কঠোরভাবে বৈজ্ঞানিক নিয়মে মুড়ে ফেলার কারণেই তিনি আজ মাঠের ভেতর অন্যদের চেয়ে আলাদা ও অপ্রতিরোধ্য।
স্প্যানিশ গণমাধ্যম ‘হোলা’ (Hola) এবং হালান্ডের নিজের জীবনের ওপর নির্মিত বহুল আলোচিত প্রামাণ্যচিত্র ‘Haaland: The Big Decision’-এর তথ্য অনুযায়ী, হালান্ডের এই ‘সুপারহিউম্যান’ হয়ে ওঠার পেছনে লুকিয়ে আছে কিছু অদ্ভুত ও কঠোর বৈজ্ঞানিক রহস্য:
প্রতিদিন ৬ হাজার ক্যালরির দানবীয় খাদ্যাভ্যাস: বর্তমান যুগে আধুনিক ফুটবলারদের ফিটনেস ও ওজনের কথা মাথায় রেখে ডায়েটে কেবল প্রোটিন শেক, সালাদ কিংবা মেপে নির্দিষ্ট পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট দেওয়া হয়। তবে হালান্ডের খাদ্যতালিকা শুনলে যে কেউ চমকে উঠবেন। তিনি প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার ক্যালরি সমপরিমাণ খাবার গ্রহণ করেন, যা একজন সাধারণ অ্যাথলেটের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। তাঁর এই বিশাল খাদ্যতালিকায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় গরুর তাজা হৃদপিণ্ড (হার্ট) এবং কলিজাসহ (লিভার) বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পুষ্টিকর মাংসের ওপর। হালান্ড নিজের ডকু-ফিল্মে বলেন, ‘সাধারণত আধুনিক যুগের অনেকেই এসব অর্গান মিট বা অঙ্গের মাংস খেতে পছন্দ করে না। কিন্তু আমি আমার শরীরের পেশি ও শক্তির যত্ন নেওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন এবং এটি আমাকে মাঠে বাড়তি এনার্জি দেয়।’
পানির ক্ষেত্রেও হালান্ডের রয়েছে চরম সতর্কতা। তিনি ঘর বা হোটেলের সাধারণ ফিল্টারের পানি স্পর্শও করেন না; তাঁর জন্য বিশেষভাবে পরিশোধিত ও খনিজসমৃদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়। এছাড়া শরীরের পেশি সতেজ রাখতে তিনি নিয়মিত কাঁচা দুধ, পালং শাক এবং কেলের (এক ধরনের পুষ্টিকর পাতা) মিশ্রণে তৈরি একটি বিশেষ জুস পান করেন, যাকে তিনি মজার ছলে নিজের ‘ম্যাজিক পোশন’ (জাদুকরী পানীয়) বলে অভিহিত করে থাকেন।
ঘুমই যেখানে সবচেয়ে বড় ও খুনে অস্ত্র: হালান্ড দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, একজন পেশাদার ফুটবলারের মাঠে পারফর্ম করার এবং ইনজুরি মুক্ত থাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো পর্যাপ্ত ও গভীর ঘুম। এই কারণে ম্যাচের ব্যস্ত শিডিউলের মাঝেও তিনি প্রতিদিন নিয়ম করে ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করেন। পাশাপাশি কড়া সূচির মাঝে নিয়মিত দুপুরেও কিছু সময় গভীর বিশ্রাম বা ‘পাওয়ার ন্যাপ’ নেন।
লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন ‘মেন্স হেলথ’ (Men's Health)-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাতে ঘুমানোর ঠিক ৩ ঘণ্টা আগে থেকেই হালান্ড চোখে একটি বিশেষ কমলা রঙের চশমা (Blue-light blocking glasses) ব্যবহার করেন। এই চশমাটি মোবাইল, ল্যাপটপ বা ঘরের সব ধরনের ক্ষতিকর কৃত্রিম নীল আলোর প্রভাব চোখ থেকে দূর করে দেয় এবং মস্তিষ্কে প্রাকৃতিক উপায়ে পর্যাপ্ত ‘মেলাটোনিন’ (Melatonin) হরমোন উৎপাদনে ব্যাপকভাবে সহায়তা করে, যা দ্রুত গভীর ও ক্লান্তিহীন ঘুমে সাহায্য করে।
এখানেই শেষ নয়, ঘুমানোর সময় হালান্ড মুখে এক ধরনের বিশেষ টেপ (Mouth Taping) ব্যবহার করেন, যাতে ঘুমের ঘোরে মুখ বন্ধ থাকে এবং কেবল নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার প্রাকৃতিক অভ্যাস বজায় থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, নাক দিয়ে শ্বাস নিলে শরীরে অক্সিজেন গ্রহণের মাত্রা বহুগুণে কার্যকর হয়, যা গভীর ঘুমে থাকা অবস্থায় হৃদস্পন্দনের স্বাভাবিক ছন্দ বা মেটাবলিজম বজায় রাখতে এবং পেশির ক্লান্তি দূর করতে দারুণ সহায়তা করে। এছাড়া বিছানায় যাওয়ার আগে রুমের সব ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও ওয়াইফাই সংযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন এই ফরোয়ার্ড।
জন্মগত মেধার সাথে বৈজ্ঞানিক ডায়েট ও প্রযুক্তির এমন অবিশ্বাস্য সমন্বয়ের কারণেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য আর্লিং হালান্ড আজ এক মূর্তিমান আতঙ্ক। ২০২৬-এর বিশ্বমঞ্চে ট্রফি কার হাতে উঠবে তা সময় বলে দেবে, তবে হালান্ড যে ফুটবলারদের ফিটনেস ও প্রস্তুতির সংজ্ঞা চিরতরে বদলে দিয়েছেন, তা বলাই বাহুল্য।
|