দেশের সব জেলাকে রেল নেটওয়ার্কে আনার পরিকল্পনা সরকারের

প্রকাশ: বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ০২:২৪ অপরাহ্ণ
দেশের সব জেলাকে রেল নেটওয়ার্কে আনার পরিকল্পনা সরকারের
বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রীবাহী ট্রেন (ফাইল ছবি)

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের প্রতিটি জেলাকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনার এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটের সম্ভাব্যতা যাচাই বা সমীক্ষা শেষ হয়েছে। তবে নতুন এই প্রকল্পগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থায়নের উৎস খুঁজে বের করা।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত ২৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি নতুন রেলপথ নির্মাণের টেকনিক্যাল সমীক্ষা সফলভাবে শেষ হয়েছে। আজ বুধবার (১ জুলাই) এক সংবাদ সম্মেলনে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে এখন অর্থসংস্থানের বিষয়টিই প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

প্রস্তাবিত এই দীর্ঘ রেলপথটি ভাঙ্গা থেকে শুরু হয়ে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর জেলা ছুঁয়ে বরিশাল, ঝালকাঠি, বরগুনা ও পটুয়াখালী পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাগরকন্যা কুয়াকাটা পর্যন্ত সরাসরি রেল সংযোগ স্থাপনই এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

এই মেগা প্রকল্পের আওতায় পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরের অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বরিশালে একটি আধুনিক মাল্টিমোডাল হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো রুটে ১৯টি বড় রেলওয়ে স্টেশন, প্রায় ১৭ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ (ভাইয়াডাক্ট) এবং বিভিন্ন নদী ও খাল অতিক্রমে ৪৬টি ছোট-বড় সেতু নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া কিছু অংশে আধুনিক আন্ডারপাস ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন ট্রেন চলাচলের নকশা করা হয়েছে।

রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ আরো জানান, বর্তমানে রেলের বাইরে থাকা অন্যান্য জেলাগুলোতেও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের জন্য নতুন করে সমীক্ষা শিগগিরই শুরু হবে। তার ভাষায়, “দেশের সব জেলাকে ধীরে ধীরে রেল নেটওয়ার্কের মধ্যে আনার পরিকল্পনা সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ। বিশেষ করে পায়রা বন্দরসহ দক্ষিণাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কেন্দ্র করে রেল সংযোগ সম্প্রসারণে সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান) ও দ্বীপ জেলা ভোলা এখনো রেল নেটওয়ার্কের বাইরে রয়েছে—সেগুলোকেও সরকারের ভবিষ্যৎ মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।”

তবে সরকারের এই বিশাল বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা নিয়ে কিছুটা সতর্কবার্তা দিয়েছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, শুধু যাত্রী পরিবহনের কথা চিন্তা না করে, রেল প্রকল্পের সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা রাখা জরুরি। তা না হলে এই বিশাল বিনিয়োগ থেকে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুবিধা মিলবে না।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, “পায়রা বন্দরকে কেন্দ্র করে আমাদের একটি শক্তিশালী আমদানি-রপ্তানি করিডোর গড়ে তুলতে হবে। ফরওয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ড লিংক নিশ্চিত করা না গেলে, এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি রেল প্রকল্প দেশের অর্থনীতির ওপর উল্টো চাপ তৈরি করতে পারে।” তিনি আরো যোগ করেন, দেশের জমির সঠিক ব্যবহার পরিকল্পনা ও সামগ্রিক পরিবহন পরিকল্পনার মধ্যে সুনির্দিষ্ট সমন্বয় না হলে, রেলপথ তৈরি হলেও তার পূর্ণ অর্থনৈতিক সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না।

উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার রেলপথ সচল রয়েছে, যা দেশের ৪৮টি জেলাকে সরাসরি সংযুক্ত করেছে। সরকারের এই নতুন মহাপরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

মন্তব্য করুন